Sunday, 7 October 2018

কাশ্মীর : প্যারাডাইস অন আর্থ


কাশ্মীর পৃথিবীর স্বর্গ বা বেহেস্ত। এখানকার মানুষগুলো নাকি বেহেস্তিদের মতোই সুন্দর। আমার হাজবেন্ড সবসময় বলে, "কাশ্মীরি মেয়েটাকে নিয়ে আমি কাশ্মীর যাবো।" শুনলেই আমার একটু কেমন লাগে। আমি এতটাও সুন্দরী নই। তবে যেদিন সে খোদ কাশ্মীরির কাছ থেকে সার্টিফিকেট পেয়েছে সেদিন কি অবস্থা হয়েছে আমি জানিনা।
আমার পাসপোর্ট, ভিসা খুব দ্রুত করেছি শুধুমাত্র কাশ্মীর যাবো বলে। প্রায় তিনমাস আগে টিকেট কেটেছি। যেতে চেয়েছিলাম এপ্রিলে টিউলিপ দেখবো বলে। কিন্তু যাওয়া হয়নি। যখন গিয়েছি তখন পাহাড়চূড়ায় বরফ আর জমিনে শুধুই ফুল আর ফুল। টিকেট কাটার পর থেকে ঘুমিয়ে, স্বপ্নে, জাগরণে শুধুই কাশ্মীর।
অবশেষে অনেক কষ্টের মাঝে সেদিন এলো। আমার চরম ভালো থাকা এবং মন্দ থাকা সবসময় পাশাপাশি অবস্থান করে। কিন্তু কাশ্মীর আমার প্রতি মুহূর্ত শুধু ভালোই রাখলো। এ আমার প্রথম দেশের বাইরে যাওয়া, প্রথম বিমানে চড়া। তাও আবার যাচ্ছি স্বপ্নের কাশ্মীর।
ওপার বাংলার ট্রেনের অভিজ্ঞতা খুব খারাপ হয়েছে। তবে মেট্রোরেল দারুণ। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখলাম। তাজমহলের আদল, অবশ্য এটা পরে জেনেছি। সারাদিন টো টো করে কলকাতা ঘুরলাম।
কত ঘণ্টা জার্নি হচ্ছে তার হিসেব নেই। তবে এসপ্ল্যানেড থেকে বাসে চড়ে এয়ারপোর্ট যাওয়ার পথে আমি শুধু উড়ছিলাম। হাজবেন্ডের পাশেই বেশ সুন্দর চেহারার এক ছেলে। আমি নিজে খুব কম কথা বলতাম শুধু ওকে দিয়েই সবার সাথে কথা বলাতাম। অন্যরা ভাবতো আমি বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ইংরাজি কিছুই পারিও না বুঝিও না। যাইহোক, ছেলেটা আর্মি। ইংরেজি কিছুই পারে না। আমরাও ভালো হিন্দি পারিনা। অনেক কষ্টে জানা গেলো সে এয়ারপোর্ট যাচ্ছে। কারণ আমরা তখনো কলকাতা হিন্দি আসছেও না, সেও আর কিছু বোঝে না। তবে ভাষাগত বাধা যে কতবড় বাধা সেটা আরো ভালো বুঝলাম এয়ারপোর্ট গিয়ে। আর্মিও আমাদের সাথেই দিল্লি যাবে এবং একই প্লেনে অথচ বোর্ডিং-এর আগে আমরা তা জানতাম না। বেচারার ভারী লাগেজের কারনে এক্সট্রা ছয় হাজার রুপি গুনতে হয়েছে। অথচ আমাদের দুজনের মিলে হালকা একটা লাগেজ। দ্বিতীয়বার এসব কথা হলো। তখন আমার 'উনি' ভালোই হিন্দি বলছে। আর্মি অবাক হয়ে বললো, "আপকো হিন্দি আ গ্যায়ি!!!" তবে আর্মি বাস থেকে প্লেন টেক অন করা অব্দি যতবার দেখেছে ততবারই আমরা মারামারি করছিলাম। বাস্তবে বয়স আমারও পাঁচ কম দেখায়, উনারও পাঁচ কম দেখায়। কারো মধ্যে কোন গাম্ভীর্য নেই। এজন্যই হয়তো ট্রাভেলমেট হিসেবে আমরা অসাধারণ!
কলকাতা "নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট" বেশ সুন্দর। আমি ছবি তোলার চেয়ে দেখাদেখিতে বেশি ব্যস্ত থাকি। আমরা দুজনই এমন। ছবি কম তুলি। সম্ভবত সাড়ে নয়টায় প্লেন টেক অফ করবে। আমি খুবই এক্সাইটেড। ওঁর হাত ধরে আছি শক্ত করে। ওঁ বুঝতে পেরে আমাকে দু'বাহুতে বেষ্টন করে রেখেছে। বলছে কিছুই হবে না, ওঁর'ও প্রথম জার্নিতে কিছু হয়নি। কে শোনে কার কথা! প্লেন টেক অফ করলো আমি স্বাভাবিক হলাম। আসলে অতি আনন্দে আমার এরকম অবস্থা। আমার সত্যিই কিছু হলো না। এমনকি অনেক উপরে উঠেও আমি বায়ুশূন্যতা অনুভব করিনি।
আমার ডাইনের ভদ্রলোক ঘুমাচ্ছেন। ওঁকে বললাম, "লোকটা প্লেনে অনেক জার্নি করে, তাইনা?" আমি ভাবলাম কত চমৎকার কলকাতা শহরের আলো, ভদ্রলোক জানালার পাশে বসেও দেখছে না! অথচ তৃতীয় জার্নিতে আমি পুরো আড়াইঘন্টা প্লেনে ঘুমিয়েছি। ওঁ ডেকে ডেকে আমায় কতকিছু দেখালো, তবুও আমি ঘুম, খেয়েই আবার ঘুম।
প্লেনে তিনটা সময় চমৎকার। টেক অফ, খাওয়া এবং টেক অন। 'জেট-এয়ারওয়েজ'এর প্লেনগুলো বেশ বড়সড়। ডমেস্টিক গুলোও। এইজন্য আরো বেশি খুশি ছিলাম আমি। যথাসময়ে খাবার এলো। খুবই সুস্বাদু চিকেন বিরিয়ানি। আরো কয়েকবার খাওয়ার পর বুঝলাম, আসলে আকাশে খাওয়া খাবার সবসময় চমৎকার। দুজন সারাপথ খুনসুটি আর গল্প করতে করতে দিল্লি পৌঁছে গেলাম।
খুবই চমৎকার "দিল্লি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট"। ৪০ মিলিয়ন ধারণক্ষমতার দিক দিয়ে এটা বিশ্বে নাম্বার ওয়ান। এখানে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছি আমরা। প্রায় এগারো ঘণ্টা। কারন আমাদের কানেক্টিভ ফ্লাইট না। আবার শ্রীনগরে এর কম ব্যবধানে ফ্লাইট থাকেও না। বাইরেও থাকিনি আমি। চেয়েছি এয়ারপোর্ট দেখবো। তবে থাকার জন্য দিল্লি এয়ারপোর্ট বেশ ভালো। বোর্ডিং-এর আগে ঘুমানোর ব্যবস্থাও আছে।
আমাদের ফ্লাইট এগারোটায়। ফ্লাইটের ২৫ মিনিট আগে বোর্ডিং গেট ক্লোজ হয় এটা এখানকার নিয়ম। টিকেটের লেখা না দেখে আজকের মতো পরেরদিনেও দৌড়ে ফ্লাইট ধরতে হয়েছে। 'এয়ার ইন্ডিয়া'র ছোট বিমান। এখানে সবাই ভেজিটেরিয়ান। নন-ভেজ হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ভেজিটেবল এত্ত টেস্টি হতে পারে আমি আগে জানতাম না।
দিল্লী ছাড়ছি আর ভাবছি আমি স্বর্গে চললাম। প্রায় একঘণ্টা পঞ্চাশ মিনিট পরে জম্মুতে এসে প্লেন ট্রানজিট নিলো। ৩০ মিনিট যাত্রা বিরতি ছিলো। কাশ্মীরি হাওয়া গায়ে লাগছে। অবশ্য পরে বুঝেছি এটা শুধুই মনের হাওয়া। তবে ছোট পাহাড় এখন থেকেই দৃশ্যমান। এবার যেহেতু ডে ফ্লাইট তাই গুগলের আর্থভিউ দারুণভাবে উপভোগ করছি। সাথে অজস্র মেঘ, মেঘের উপর দিয়ে ভেসে চলা, পাশে এমন রোমান্টিক একজন মানুষ। সবমিলিয়ে আমি তখন অন্য আমি। দেখতে দেখতে চলে এসেছি মেঘে ঢাকা পাহাড়ের দেশে। এই সেই সম্রাট আওরঙ্গজেব-এর জান্নাত। শ্রীনগর এয়ারপোর্ট-এ নামার আগে আমি একমুঠো স্বর্গই যেনো দেখতে পাচ্ছিলাম।
বিমান টেক অন করছে পাহাড় দিয়ে ঘেরা, পাহাড়ের উপরে সৌন্দর্যে ভরপুর এক শহরে। আমি মুগ্ধ, বিমোহিত, বিস্মিত! কেন জানি মনে হয় এ আমার পূর্ব পুরুষদের আবাসভূমি। বংশীয় ইতিহাস বলে, গবেষণা করলে ধারণা সত্য প্রমাণিত হবার চান্স ৯৫%। এই এয়ারপোর্ট খুব বেশি বড় নয়। বেল্ট থেকে আমাকে লাগেজ তোলার ভাড় দিয়ে উঁনি লাপাত্তা। কিছুক্ষণ পরে কেউ একজন কাধে টোকা দিলো। তাকিয়ে দেখি একদল ছেলে। কিন্তু এদের এক্সপ্রেশন বলেনা যে আমাকে এইমাত্র এদের কেউ টোকা দিয়েছে। কি অদ্ভুত!!! একটু দূরে এক মেয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে ইশারা করলো। কিন্তু আমি তাকে চিনি না। আমাকে পেছনে ফিরতে বললো আর আমার অদ্ভুত এক্সপ্রেশন সে খুব আনন্দ পেয়েছে। মেয়ে কাশ্মীরি নয় হয়তো ঘুরতে এসেছে কিন্তু হাসি দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। ট্রাভেলমেটকে একটু চুলটানা দিলাম আমাকে এভাবে অপ্রস্তুত করার জন্য।
কাশ্মীরের সবচেয়ে বড় ঝামেলা ব্রোকার বা দালাল। তবে খুব বেশি খারাপ নয় এরা। কারণ এটাই তাদের প্রধান অথবা একমাত্র আয়ের উৎস। কাশ্মীরকে শুষে নিয়েছে ভারত। এ নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক আছে। আমার জানা ইতিহাস এবং সেখানকার সাধারণ জনগনের কথা পর্যালোচনা করলে অনেক কিছুই বোঝা যায়। তবে এই প্রসঙ্গে যাবো না। কাশ্মীর যাচ্ছি শুনে পরিবারের লোকজন কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলো। কি না কি হয়! ট্যুরিস্টদের জন্য কাশ্মীর ১০০% সেইফ জায়গা। ট্যুরিস্ট শুনলে আর্মি, পুলিশ, গার্ড সবাই খুশি হয়।
কাশ্মীরে খরচ কমানোর একমাত্র উপায় পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা। অবিশ্বাস্য কম খরচে ঘুরাঘুরি করা যায়। সারা ইন্ডিয়ার কোনো সিমকার্ড কাশ্মীরে চলবে না। পাওয়ার নেওয়া থাকলেও চলবে না। তাই কাশ্মীর গিয়েই সিমকার্ড নেওয়া উচিৎ। আমরা বাসে চড়ে ডাললেকের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আমাদের দুজনের এ বিষয়ে কোনো আপত্তি নেই। পুরো ট্যুর ব্যাকপ্যাকার হয়ে ঘুরেছি। এলিট চাল নিজের এলাকার জন্য রাখা ভালো, ট্যুরে গিয়ে ওসব দেখিয়ে লাভ নাই। শুধু খাওয়ার ব্যাপারে কন্সার্ন থাকা উচিৎ। ভালমতো না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে।
আমাদের প্রথম স্টোপেজ "ডাললেক"
লালচক নেমেই একজন বোটহাউজ মালিকের সাথে দেখা। আমি যখন বাসে বসে ছিলাম তখনো একজন বোটহাউজ মালিক তার ওখানে উঠার জন্য ওঁর কাছ থেকে একেবারে কথা নিয়ে ছেড়েছিলো। ব্রোকার সমস্যাটা মূলত এয়ারপোর্ট থেকেই শুরু হয়ে যায়। আমরা ভাবলাম এই মালিক সেই ব্রোকারের পাঠানো লোক। আমরা যাবো ডাললেক। লেকের প্রতিটা ঘাট ১, ২, ৩ ক্রমিক সংখ্যায়। সংখ্যা যত বাড়বে সৌন্দর্য ততো বাড়বে এবং রাজকীয় বোটহাউজ পাওয়া যাবে। যদিও আমাদের যাওয়ার কথা ছিলো ৭ নং ঘাটে কিন্তু বোটহাউজ মালিক নিয়ে এলেন ১৬/১৭ নং ঘাটে নেহেরু পার্কের পাশে। ঘাটগুলো কাছাকাছি।
তিনি আমাদের শিকারাতে করে স্টার অফ কাশ্মীরে নিয়ে গেলেন। পুরো কাশ্মীরে বিব্রত হওয়ার এই একমাত্র কারণ কিছু ব্রোকার এবং বোট হাউজ মালিক। এদের হাত থেকে ছাড়া পাওয়া খুবই কঠিন। যেকোনোভাবে এরা তাদের নির্দিষ্ট প্যাকেজ নিইয়ে ছাড়বে। এবং প্যাকেজ মূল্য অস্বাভাবিক চড়া। নতুন কেউ হলে তো কথায় নেই, শিওর আটক। এপর্যন্ত যাদের ব্লগ পড়েছি সবার এই হাল। প্যাকেজের মধ্যে কাশ্মীরের সব দর্শনীয় স্থান এবং খাবার থাকে। তারা তাদের গাড়ীতে করে নিয়ে যায় আসে। অর্থাৎ প্যাকেট হয়ে কাশ্মীর ঘুরাঘুরি করা এবং চলে আসা। জানতেই পারা যাবে না সাধারণ কাশ্মীরি কেমন, শুধু ব্রোকারকেই চেনা হবে। যাইহোক বোট মালিকের পাল্লায় পড়ে একরাত বোট হাউজে ছিলাম। একরাত ওখানে থাকা অবশ্যই ফেন্টাসি তার বেশি থাকলে মনে হবে আমি বন্দি কারাগারে। তবে বেশ ভালোই। কিন্তু ফ্যাসিলিটির দিক দিয়ে এখানকার হোটেলের তুলনাই অনেক নিচে। আর আমি ভেবেছিলাম রাতে বাইরে বসবো কিন্তু পারাপারের সময় নৌকাতে যে সৌন্দর্য দেখা যায় সেটাই তুলনাহীন। আর ভোরবেলা তো অসাধারণ!
ব্যাগপত্র রেখে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম খাওয়ার উদ্দেশ্যে। ডাললেক পার হয়ে ডালগেটে এসে খাবার জন্য হন্য হয়ে খুঁজে খুঁজেও ব্লগে পড়া সেই ফুডস্ট্রিট পেলাম না। তারপর বাসে করে ১০ রুপিতে লালচক। আলু পরোটা এবং ছোলা স্থানীয় নাম জানিনা। অসাধারণ টেস্ট। এবং খাবার অবশ্যই সস্তা। আর ইন্ডিয়ার যত জায়গা চা খেলাম সবই টেস্টি। কাশ্মীরি চা টাও অনেক টেস্টি। এরপর ডাললেকের আশেপাশেই খেয়েছি তবে বেশিরভাগ ভেজিটেরিয়ান রেস্টুরেন্ট। নন-ভেজ কম। সেদিন শহরে বেশ হাটাহাটি করলাম। ফুটপাথ এবং পাশের দোকানগুলোতে কাশ্মীরি শাল ও অন্যান্য জিনিশ দেখলাম তবে ফুটপাথে অনেক সস্তা একই জিনিশ দোকানে অনেক বেশি দাম। কাশ্মীরি শাল বিখ্যাত। এর উপর কারুকাজ অসাধারণ এবং স্বকীয়তা আছে। ঘুরতে ঘুরতে রাত হলো। লেকের পাশে বসে আছি হঠাৎ সকালে দেখা এবং আমার হাজবেন্ডের ভাষায় হ্যান্ডসাম মাঝি আমাদের ডাকতে এলো। বাইরে থেকে খাবার নিয়ে যায়নি তাই সে আমাদের ভাসমান মার্কেটে নিয়ে গেলো। যেতে যেতে অনেক কথা হলো মার্কেটও দেখা হলো। এই সুদর্শন মাঝি চণ্ডীগড় থেকে কায়াকিং গোল্ড মেডেল প্রাপ্ত। সে আমার ট্রাভেলমেটকে বললো, "আপনার ওয়াইফ বিউটিফুল"। শুনে আমি রক্তজবা হয়ে গেছিলাম। নৌকায় আমিও কিছুক্ষণ বৈঠা চালিয়েছিলাম। এরপর বোটহাউজে ফিরে গেলাম।
বোটে ফিরলে বোট মালিক তার অন্য বোট হাউজের বাংলাদেশি দম্পতিদের সাথে দেখা করালেন। মূল উদ্দেশ্য তাদের সাথে প্যাকেজে ইনক্লুড করে দেওয়া কিন্তু এই মেরিনে চাকুরীজীবী ধনাঢ্য পরিবারের সাথে দেখা হয়ে খুব উপকার হলো। উনারা ছিলেন আরো এক সপ্তাহ আগে থেকে। গুলমার্গ বাদে আর সব জায়গা ঘুরে ফেলেছেন। দুজনে মিলে খুব সুন্দর রিভিউ দিলেন। যেহেতু উনাদের ছোট ছোট দুই বাচ্চা তাই প্যাকেজ নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট কিন্তু বন্দি বন্দি একটা ব্যাপার থেকেই যায়। কারন কাশ্মীরে সন্ধ্যা ৮ টায় হলেও পুরো শহর প্রায় ফাঁকা হয়ে যায় তখন। ডাললেক একটু দেরিতে। তবুও এখানকার মানুষের রাত নামে দ্রুত। একটা কারণ হয়তো ঠান্ডা কিন্তু অন্য কারণ অবশ্যই রাজনৈতিক।
বোটহাউজে থাকা এক্সেপশনাল। মনে হয় প্রাক্তন যুগে ফিরে গেছি। যদিও এগুলো রাজকীয় এবং অসাধারণ কারুকার্যময়। তবে বাইরে থেকে দেখতেই বেশি ভালো লাগে। বিশেষ করে সন্ধ্যাবেলা। বোটহাউজের আলো তখন মহনীয় মনে হয়।
খুব সকালে উঠে দুজন ব্যাগ গুছিয়ে বেড়িয়ে গেলাম। অনেক কষ্টে বোট মালিকের হাত থেকে রেহাই মিললো। খুব সকালে ডাললেক পার হচ্ছি কাশ্মীরের ঘুম তখনো বুঝি ভাঙেনি। এখানে সবাই খুব দেরিতে উঠে। সম্ভবত সকালের শীতের কারনে। তবে নৌকা থেকে যে দৃশ্য দেখলাম তা ভোলার নয় কখনো। সামনে মেঘাচ্ছন্ন বিশাল উঁচু পাহাড় আর লেকের পানিতে ভাসতে ভাসতে চলেছি আমরা। এতদূর থেকে যাওয়া যেনো তখনই সার্থক হয়ে গেছে। পারে এসে অটো নিয়ে হোটেলে রওনা দিলাম।
আগেরদিনেই হোটেলে কথা বলে এসেছিলাম। বোট হাউজ আমার দুটো কারণে অপছন্দ একেতো বন্দী তার উপর ফ্যাসিলিটি কম। অর্থাৎ ওয়াশরুমের বেহাল দশা। ওখানে গরম পানি ছাড়া গোসল অসম্ভব কষ্টের। আরো কিছু ব্যাপার আছে। ওইখানকার জন্য যদিও যথেষ্ট কিন্তু হোটেলের তুলনায় অনেক ব্যায়বহুল। অথচ এখানে ১০০০ বা ৯০০ রুপিতে একেবারে ডাললেকের সাথেই ভালো হোটেল রুম পাওয়া যায়। রুম অসাধারণ এবং এখানে সিংগেল রুম বা বেড পাওয়া যায় না। সবই তিনজনের থাকার মত। তবে বোট মালিকের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আনতে পারা মানে যুদ্ধে জয়ী হওয়া।

আমাদের দ্বিতীয় স্টোপেজ "গুলমার্গ"
রুমে এসেই কোনোরকম ব্যাগ রেখেই বেড়িয়ে পড়লাম গুলমার্গের উদ্দ্যেশ্য। আমাদের টার্গেটই ছিলো যে আমরা বাস বা এরকম লোকাল ট্রান্সপোর্ট ইউজ করবো। তবে এখানে বাস কম কিন্তু শেয়ার জিপ এভেইলেবল। খুবই কমফোর্টেবল, উবারের চেয়েও। এবং ভাড়াও একেবারে কম। অক্ষয় খান্নার মতো দেখতে অটোওয়ালা আমাদের নিয়ে চললেন টার্মিনাল পারিমপোরা। মূলত তার কাছ থেকেই আমরা এই পরামর্শ পেয়েছি। চললাম পারিমপোরা।
টার্মিনাল থেকে বাসের চেয়ে শেয়ার জীপ বেশি ছেড়ে যায়। বাসের ড্রাইভার হেলপার সব একেকটা নায়ক আর মেয়েগুলা নায়িকা। খুব খারাপ লাগে ঠিক আমাদের দেশের অফিসারের মতো দেখতে একটা লোক যখন অটো বা ট্যাক্সি চালায়। রাস্তাঘাটে শুধুই সুন্দর মুখ। কথাবার্তায় দারুণ স্মার্ট। ম্যাক্সিমাম ড্রাইভার গুলো খুব ভালো ইংরেজি জানে। গুলমার্গ যেতে হলে আগে ট্যানমার্গ গিয়ে নামতে হয় কারন এই পর্যন্ত মোটামুটি সমতল। এর পর উঁচু পাহাড় শুরু। এরপর গুলমার্গের গাড়ী এখান থেকেই পাওয়া যায়।
এই নয়নাভিরাম পথটাতে যা আছে তাতে মনে হবে সত্যি স্বর্গে চলে এসেছি। পরিছন্ন একটা শহর, পরিচ্ছন্ন রুচিশীল মানুষ, এই ত্রাসের শহরে থেকেও সদা হাস্যজ্জল মুখ। কোথাও না ঘিঞ্জি না অতিরিক্ত গ্যাঞ্জাম। আর কি কিউট কিউট বাচ্চা! মন চায় চুরি করে নিয়ে যাই। অবশ্য জম্মু যাওয়ার সাথে সাথে এই ইচ্ছে উধাও হবে। কাশ্মীরিরা খুবই সদালাপী মিষ্টিভাষী, বিনয়ী, অতিথি পরায়ণ, যেচে কথা বলবে, রাগারাগি কেউ কারো সাথে করবে না। নিজেদের মধ্যেও খুব বেশি আন্তরিক এরা। সবাই সবাইকে সাহায্য করে সেখানে আমরা ভীনদেশি আরো যেনো বেশি সুবিধা দিতে চায় আমাদের। টুরিস্ট স্পটের আশেপাশের ব্রোকারদের দিয়ে কাশ্মীরিদের বিচার করাটা চরম ভুল। আর কেউ যদি প্যাকেজ নিয়ে প্যাকেট হয়ে ট্যুর দেয় তবে কাশ্মীরের স্বর্গের আধা স্বাদ নেয়া বাকী থেকে যাবে। অবশ্য আমার কাছে এটা আধার চেয়েও অনেক বেশি।
সব কাশ্মীরি যখন শোনে বাইরে থেকে এসেছি খুব খুশি হয়, বাংলাদেশ বললে কেনো জানি আরো বেশি খুশি হয়। এবং সবার আগে যে প্রশ্নটা করবে তা হলো কাশ্মীর কেমন লেগেছে এবং এটা বলতেই হবে, "এক্সিলেন্ট এন্ড ইটস রিয়েলি হ্যাভেন।"
অতঃপর আমরা স্বর্গের রাস্তা ধরে গুলমার্গের দিকে এগোতে লাগলাম। যেহেতু পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট এখানে কাস্মীরের অনেক ধরনের মানুষের পরিচয় মেলে। তবে এদের একই বৈশিষ্ট্য সেই হাসিমাখা মুখ, আন্তরিকতাপপূর্ণ চোখ এবং অমায়িক ব্যবহার। আমি আবেগ দিয়ে লিখছিনা বা বাড়িয়েও বলছি না। যে কেউ এভাবে গেলে, মিশলে ভাববে আমি কম বলেছি।
এখানকার ঘরবাড়ি খুবই বৈচিত্র্যময় যেনো শিল্পীর মনের তুলি দিয়ে আঁকা। কি ধনী কি গরীব সবারই ঘর এমন সুন্দর। ঘরের রঙ দেখেই এদের রূচির মাপ বোঝা যায়।

গুলমার্গের সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো গন্ডোলা রাইড অর্থাৎ কেবল কার। যদিও আমরা পনি রাইডে (ঘোড়ায় চড়ে) পাহাড়ে উঠেছি। পনি রাইড গন্ডোলার চেয়ে সাশ্রয়ী হলেও শীতকালে বরফ ঢাকা গুলমার্গ দেখতে হলে গন্ডোলার বিকল্প নেই। এবং ঘোড়া ফেজ-২ পর্যন্ত যায় না যেখানে গন্ডোলা যায়। পেজ-২ এর ওপারেই পাকিস্তানের বর্ডার। ফেজ-১ পর্যন্ত উঠেই বৃষ্টি শুরু হয়েছিলো। এখানে বেশিরভাগ সময়ই বৃষ্টি হয় এজন্য শীতও করে। তাই সিজন যেটাই হোক না কেনো সাথে শীতের কাপড় নিয়ে যেতে হবে।
এই অংশটাতে রয়েছে খাবার হোটেল। এখানকার খাবার চমৎকার বিশেষ করে কাশ্মীরি বিরিয়ানি। দাম খুব বেশি নয়। রেস্টুরেন্টের সামনেই রয়েছে "সেভেন ওয়াটার ফল" যেখানে মিলিত হয়েছে সাত জায়গা দিয়ে আসা ধারা। বরফ সমান ঠান্ডা। পাহারে আছে মেঘ এবং প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। চারিদিকে ভেড়ার পাল চড়ে। একপাশে অনেকগুলো যাত্রীবাহী ঘোড়া দাঁড়িয়ে। আজীবন মনে রাখার মতো দৃশ্যপট।
ফেরার সময় আমার বেশ কষ্ট হয়েছিলো। গুলমার্গের খাড়া পাহাড় থেকে গাড়ীগুলো ঘুরে ঘুরে নামে। খাওয়ার পরেই যেহেতু রওনা দিয়েছিলাম তাই আমার ভীষণ গা গুলাচ্ছিলো। এইজন্য খাওয়ার পর কিছু সময় রেস্ট নিয়ে তারপর নামা উচিৎ। শরীর সুস্থ করতে ট্যানমার্গ এসে আইসক্রিম খেলাম। এত চমৎকার স্বাদের হাতে বানানো আইসক্রিম আগে কখনো খাই নি আমি।
ট্যানমার্গ থেকে যে লোকাল গাড়িতে আসছিলাম সেটা আমাদের মাঝপথে নামিয়ে দিলো, বললো বাসে গেলে সুবিধা হবে। ওদের গাড়ী অন্যপথে যাবে। যেহেতু আমরা লোকাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করছি তাই এই বিষয়গুলো আগেই মাথায় ছিলো। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর বাস পেয়ে গেলাম সেই সাথে পেয়ে গেলাম উলফাত নামের এক বাংলাভাষী মেয়ের দেখা। আমি গাড়ীতে ওঠার পর মেয়েটা বলে উঠলো "যদি আমি পড়ে যেতাম?! এটা আমারই একটু আগে করা উচ্চবাক্য যেটা ছিলো আমার সঙ্গীর উদ্দ্যেশে। আমি দেখলাম খুব মিষ্টি চেহারার লাস্যময়ীকে। পাশের বাচ্চা মেয়েকে দাড় করিয়ে দিয়েছে আর ভাইটাকে কোলে নিয়ে আমাকে বসার জায়গা করে দিয়েছে। এই অবাঙালী যাত্রীদের মাঝে বাংলা শোনার যে কি আনন্দ তা বলে বোঝানো যাবেনা। জিজ্ঞেস করলাম, বাংলা পারো?! বলে, শিখেছি। মা আর খালাকে দেখিয়ে বললো এরা যে বাংলাদেশি। হাজার হাজার মাইল পার হয়ে দুনিয়ার তাবৎ লোকের ধারণা অনুযায়ী মৃত্যুপুরী নামক স্বর্গে গিয়ে মেহেরপুরের দুই প্রৌঢ়ার দেখা পেলাম। অবাক এইজন্য হইনি, অবাক হয়েছি এই লোকাল ট্রান্সপোর্টে এদের দেখা পেয়ে। মেয়ের নাম উলফাত। বাংলা শিখেছে কাজিনদের কাছ থেকে। বলে কাশ্মীরি ভাষা নাকি খুব কঠিন। কঠিন বটে হিন্দি উর্দুর ধারেকাছে নাই।
আমি উলফাত শব্দের অর্থ জানিনা। এ নাম আমার খুব প্রিয়। এ নামের একজন সাইকেলে তুলে এক সন্ধ্যা আমায় ঘুরিয়েছিলো। সে সন্ধ্যা ওই অব্ধি সেরা সন্ধ্যা ছিলো। কয়েকমাস আগে ভেবেছিলাম মেয়ের নাম উলফাত রাখবো। উলফাতে বাংলা না জানার কাহিনী যেমন মজার তেমনি আমার তার শেখানো ভাটমৌলি উচ্চারণ করতে দুই মিনিট লাগলো যদিও আমি নিশ্চিত নই শব্দটা ঠিক আছে কিনা।
লোকাল ট্রান্সপোর্টে চড়ার কারণে খুব কাছ থেকে কাশ্মীরিদের সাথে মিশতে পেরেছি। এরা এত বেশি অতিথিপরায়ণ যে আপনি মুগ্ধ হতে বাধ্য। আর সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশাল গান কাধে ভয় ধরানো চেহারার পুলিশ বা গার্ডও একটা কথা আবশ্যকীয়ভাবে জিজ্ঞেস করবে, কাশ্মীর কেমন লেগেছে? এবং আপনি উত্তর দিবেন, এক্সিলেন্ট, এক্সিলেন্ট এন্ড এক্সিলেন্ট।
এদের রুচিবোধ ও আভিজাত্য নজরকাড়া সে টেক্সি ড্রাইভার হোক কিংবা বাসের হেলপার। যে লোক বলে দুনিয়ার নারীর চেয়ে পুরুষ সুন্দর সে যেনো একবার কাশ্মীর ঘুরে আসে। কি নারী কি পুরুষ, সৌন্দর্য দেখবেন আর ওয়াও রিয়েক্ট দিবেন।
আমাদের তৃতীয় গন্তব্য "শ্রীনগর শহর"।
শ্রীনগর শহরে দেখার মতো তেমন কিছু নেই ছোট ছোট পার্ক ছাড়া। সেগুলো দেখতে সব প্রায় একই রকম। বাইরে থেকেই ভালভাবে দেখা যায় ভেতরে যাওয়ার দরকার পড়ে না। কিন্তু একটা জিনিস একেবারেই মিস করবেননা সেটা হলো হযরতবাল মসজিদ। বলা হয় এখানে রসূল (সঃ) এর চুল মুবারক সংরক্ষিত আছে। মসজিদ থেকে ফিরতে বেশ দেরি হয়েছিলো আমাদের। তবে এর মধ্যে অনেক স্থানীয় দোকান পাট ঘুরেছি। কাশ্মীরি শাল কিনেছি। সন্ধ্যা হতে না হতেই শহরের মানুষজন কমতে থাকে। এইজন্য দ্রুত খাব খেয়ে নেওয়া উচিৎ।
রাতে "কফি ক্যাফে ডে" তে বিরিয়ানি খেলাম। সম্ভবত কাশ্মীরিগণ অনেক বেশি খায় এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। এইজন্য রেস্টুরেন্টএ খাবার দেয় প্রচুর। আমরা দুজনই যেহেতু একটু কম খাই তাই একটা খাবারই শেষ করতে পারতাম না। চিকেন বিরিয়ানীর স্বাদ ছিলো চমৎকার। আমরা দুজন মিলে একটা খাবার খেলাম আরেকটা খাবার হোটেলের রিসিপশনে থাকা ছেলেটার জন্য নিয়ে এলাম। খাবার পেয়ে ছেলেটা তো মহা খুশি। আমাদেরও খুব ভালো লাগছিলো।
আমাদের চতুর্থ গন্তব্য "পেহেলগাম"।
কাশ্মীরের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা পেহেলগাম। শ্রীনগর থেকে প্রায় ৮৭ কিলোমিটার দূরে। লালচক বাসস্ট্যান্ড থেকে শেয়ার জীপে উঠে বসলাম অনন্তনাগের উদ্দ্যেশ্যে তবে পরে আমরা যাত্রীদের পরামর্শে লোকাল রোড দিয়ে পেহেলগাম যাই।
এইখানে আমারো একটা গল্প আছে। এই সৌন্দর্যময় রাজ্যের ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চা আমাকে দেখেই মিষ্টি হাসে আর যতক্ষণ দেখা যায় তাকিয়ে থাকে। বড়রা কেউ কেউ বাইক থেকে পড়েও যায়। আমি কিছুতেই কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। আমি আহামরি সুন্দরিও নই। যদিও ইতোমধ্যে এক কাশ্মীরি আমাকে বিউটিফুল বলে দিয়েছে। কারণ খুঁজে পেলাম এই শ্রীনগর থেকে পেহেলগাম যাবার পথে। শেয়ার জীপে আমার পেছনের সিটে বসা যাত্রী চুল নিয়ে কিছু বলছিলো। আমি একটু বিচলিত হয়ে গেলাম। আমার চুল বেশ ছোট উড়ে গিয়ে তার মুখে পড়ার কথা নয়। একটু পরে তিনি আবার বললেন, বেহেন জি, জারা বাল-শাল বাধকে লো দোপাট্টা -শোপাট্টা লে লো। কাশ্মীরিই তো লাগতে হো। উছে (গার্ড) লাগেগা কি তুম কাশ্মীরি হো। ও কুছ পুছেগা নেহি।" আমি বিশ্ব সুন্দরীর মুকুট পেলেও এত্ত আনন্দিত হতাম না। আমার বর সারাক্ষণ বলতো কাশ্মীরি মেয়েটাকে নিয়ে কাশ্মীর যাবো। আমি ভাবতাম বাড়িয়ে বলে কিন্তু এই কথা শুনে ও তো আকাশে উড়ছে আর আমি লজ্জায় কাশ্মীরি আপেলের মতো লাল হয়ে গেছি। ওই বাচ্চাকাচ্চা আমাকে কাশ্মীরি ভাবতো কিন্তু ভেবে কুল পেতো না আমি কেনো কাশ্মীরি ড্রেস পরি নাই।
এখানে পুলিশ বা গার্ড টুরিস্টদের খুবই খাতির করে কিন্তু টুরিস্টদের সব লোকাল এরিয়া দিয়ে যাওয়া নিষেধ। শুধুমাত্র অনুমোদিত রোড দিয়েই যেতে পারবে। যদিও আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। কাশ্মীরি লোকজন আসলেই চমৎকার হয়। বিশেষ করে সাধারণ জনগন। এখানেও লোকাল ট্রান্সপোর্টের কারণে লোকাল কাশ্মীরিদের সাথে ভাব বিনিময়ের সুযোগ হয়েছে এমনকি তাদের সাথে খাবারও শেয়ার করেছি। খাবার শেয়ারের ব্যপারটা আমার সবসময়ই ভালো লাগে।
পেহেলগাম পৌঁছেই আমরা বেশ ভালো একটি হোটেল পেয়ে গেলাম। কাঠের হোটেলটি চমৎকার সাজানো গোছানো এবং জানালার ভিউ অসাধারণ। ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম বিখ্যাত সে বাইসারানের উদ্যেশ্যে যেখানে শুটিং হয়েছিলো সালমান খানের সুপারহিট সিনেমা "বজরঙ্গি ভাইজান"-এর। বাইসারান মিনি সুইজারল্যান্ড হিসেবে পরিচিত। এবং আসলেই সুন্দর যায়গা। বাইসারান যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো ঘোড়া। উঁচু নিচু খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠানামা রীতিমত দুঃসাধ্য। যখনই ঘোড়াওয়ালা বলে রোজ একজন না একজন পড়ে যায় তখন আমার ভয় আরো বেড়ে যায়। উচ্চতা ভীতি সম্পন্ন আমার জন্য তাই এটা ছিলো দঃসাহসিক অভিযান।
আরু ভ্যালী, বেতাব ভ্যালী সহ পেহেলগামে ঘুরে বেড়ানোর মতো আরো জায়গা আছে। তবে পেহেলগাম শহরটার ঠিক সামনেই আছে পেহেলগাম পার্ক। পার্কে আছে অসাধারণ সব বুনো ফুলের সমাহার। পার্কের ভেতর দিয়েই বয়ে চলেছে পেহেলগাম নদী এবং লিডার নদী। এই নদীর পানিতে রাফটিং করা যা্য। গ্রীষ্মেও বরফের মতো ঠান্ডা থাকে নদীর পানি। তবে শীতে জমে একেবারে বরফই হয়ে যায়।
পেহেলগাম সবসময়ই সুন্দর তবে বিকেলটা আরো বেশি সুন্দর। বিকেলের স্নিগ্ধতা আর দুপাশের নদীর নীরবতা মিলে এক স্বর্গীয় আবহ সৃষ্টি হয়। নদীর দুপাশের পার্কগুলোতে স্থানীয়রা এসে গল্পগুজব আর আড্ডায় মেতে উঠে। অবশ্য সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথেই পার্কগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এইসময় নদীর পার ধরে হেটে চলা ঠিক যেনো কোনো চিত্রকরের ক্যানভাসে ঢুকে পড়া। বিকেলের চা চমৎকার ছিলো। যদিও এখানকার খাবার আমার খুব বেশি ভালোলাগেনি।
যেহেতু পেহেলগাম সবচেয়ে সুন্দর তাই এই জায়গার জন্য দুই বা তিন দিন বরাদ্দ রাখা উচিৎ। এখানকার হোটেল খরচও কম আবার পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে। হয়তো পাহাড়ের উপরের হোটেল আরো সুন্দর হবে। তবে আমার মনে হয় শহরের প্রাণকেন্দ্রে থাকলেই ভালো। এখান থেকে লিডার নদী এবং পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য দেখা যাবে।
সকালবেলায় পেহেলগামে বেশ শীত অনুভূত হয় তবে রোদ বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা হুট করে বেড়ে যায়। সকালটা খুবই মিষ্টি। শুনশান পরিবেশে হেটে বেড়াতে ভালো লাগে। সকালের নির্মল হাওয়ায় প্রাণ ভরে শ্বাস নেওয়া যায়।
এই সকালটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আমাদের কাশ্মীর ভ্রমণও সমাপ্ত হতে থাকে। কিছু কাশ্মীরি নাস্তা খেয়ে শেয়ার জীপে করে জম্মুর উদ্দ্যেশ্যে রওনা দিই। পেছনে পড়ে যায় পেহেলগাম, আরো পেছনে শ্রীনগর। অবশেষে বিদায় জানাতে হয় কাশ্মীরকে। ভালোলাগার এক অপূর্ব অনুভূতি নিয়ে ফিরে আসি। এই স্মৃতি হয়তো বয়ে নিয়ে যাবো আমরন।

বিঃদ্রঃ কাশ্মীর ট্যুরের খরচ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে নিচে দেওয়া লিংকের লেখাটা পড়ুন...

No comments:

Post a Comment