Friday, 27 September 2019

আবার যাবো কাশ্মীর! (কাশ্মীর ভ্রমণ-২০১৮)


ঢাকা থেকে বাসে বেনাপোল বর্ডার গেলাম প্রথমে। ইন্ডিয়ান কাস্টমস সাথে এক হাজার রূপি থাকার অপরাধে ৩০০ রূপি ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দিলো। এরপর ৩০ রূপি দিয়ে বনগাঁ রেলস্টেশন, সেখান থেকে ২০ রূপিতে ট্রেনে শিয়ালদহ। সারাদিন কোলকাতা ঘুরে সন্ধায় এলাম সুভাষ চন্দ্র ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এ। রাত ৯ টায় উঠলাম জেট এয়ারওয়েজের একটা বড়সড় বিমানে। এই বিমানের এয়ারক্রুরা বেশ স্মার্ট ছিলো (আমি মেয়েদের কথা বলতেছি)! দেখেই মন ফ্রেশ হয়ে গেলো। বিমান আকাশে উড়ার সাথে সাথে একটু গরম লাগা শুরু হয়েছিলো। কিন্তু অনেক টানাটানি করেও জানালা খুলতে পারিনি। 

পরে বুঝেছি বিমানে এসি ছিলো!  তখন ঠান্ডায় জমে গেছিলাম। ঠাণ্ডা দূর করার জন্য এয়ারক্রুরা ওয়েটার সেজে বেশকিছু আইটেমের খাবার দিলো। খুবই টেস্টি এবং মিস্টি। ইয়ে মানে মিস্টি মেয়েটার কথা মনে পড়ছে খুব।  মেয়েটাকে চোখ টিপ দিয়েছিলাম। আমাকে পালটা হাসি দিয়ে চোখ টিপে দিয়েছিলো। বিমানভাড়া এইখানেই উসুল হয়ে গেছিলো আরকি! 
প্রায় দুই ঘন্টা পর দিল্লী নেমে বিমান পালটে জম্মু হয়ে শ্রীনগর পৌছলাম পরদিন দুপুর এক্টায়। এয়ারপোর্ট নেমেই কাশ্মীরের রূপ দেখা শুরু। কিন্তু কাশ্মীর দেখলাম কেমন অন্ধকারময়। মন খারাপ হওয়া শুরু হইতেছিলো। সানগ্লাসটা চোখ থেকে নামানোর পর দেখি, নাহ! সব ঠিকই আছে। 😎
এয়ারপোর্ট নামার সাথে সাথেই বেশকিছু ট্যাক্সি ড্রাইভার/বোট হাউজ দালাল ঘিরে ধরলো। আমি ট্যাক্সি নেয়ার বিলাসিতা না করে বাসে ৩০/- ভাড়া দিয়ে চলে গেলাম লালচক। সেখান থেকে আবারো অটোতে করে ১০০/- টাকায় "ডাল লেকে"! ওখানে গেলে আবারো ঘিরে ধরে একঝাক বোট হাউজ মালিক/কর্মচারী। ডাল লেকের শুরু থেকে শেষ মাথা অব্দি অনেকগুলো গেট বা ঘাট। এসব ঘাট ১, ২, ৩ এভাবে নাম্বার দেয়া। ঘাটের সংখ্যা যতো বাড়বে "বোট হাউজের" দাম তত কমবে কিন্তু সৌন্দর্য আরোও বাড়বে। আমরা ছিলাম মূল লেকে, ঘাট নাম্বার ১৭ তে। এসব ঘাট থেকে ছোট নৌকায় করে লেকের উপারে থাকা বোটে নিয়ে যাওয়া হয়। বোট হাউজটা খুব সুন্দর ছিল। (আসলে সবই সুন্দর)! এক রাত ছিলাম ১০০০/- রূপিতে (বাংলা টাকায় ১৩০০/- প্রায়)। বোট হাউজে আমাদের পারাপার করছিলো সৈয়দ রেহান নামে এক স্মার্ট মাঝি। শখের মাঝি মূলত ছাত্র। সে আমাদের ভাসমান মার্কেটে নিয়ে গিয়েছিলো শখ করে। আমি ওর ছবি তুলেছি। ছবি ভালো আসে নাই বলে মাঝি খুব মন খারাপ করে।
ডাল লেক নাম শুনে কেউ আবার এই লেকের পানি দিয়ে ভাত খাওয়ার চিন্তা কইরেন না। ডাল লেকের পানিতে ডাল নেই, একেবারে সাদামাটা পানি। লেকের একপাশে বিশালাকার পাহাড়। পাহাড়ের সাথে লেকের পানির সৌন্দর্য কোন ক্যামেরায় তুলে আনা সম্ভব নয়, আমিও পারিনি।
বিকেলবেলা লেকের পানিতে ২০০/৩০০ রূপিতে এক ঘন্টার জন্য নৌকা ভ্রমণ করা যায়, স্থানীয় ভাষায় একে "শিকারা রাইড" বলে। ভালোই লাগছে এটা।
ডাল লেকের সাম্নের রাস্তার ফুটপাতে বিকেল হলে হকাররা বসে স্থানীয় শাল, চাদর, বাদাম ইত্যাদি আইটেম বিক্রির জন্য। দাম খুব কম মনে হইছে আমার। কোয়ালিটি ভালো। আপেলের কেজি ৫০ রূপি। যদিও "বিটিভির বাতাবি লেবু" সাইজের আপেলগুলা পানসে।
কাশ্মীরে সন্ধ্যা হয় "রাত আটটায়", সিংগাপুরের মতো। তবে শ্রীনগরের ডাল লেক এলাকা ছাড়া অন্যান্য এলাকা সন্ধ্যার পরই জনশূন্য হয়ে যায়। শ্রীনগরের পথে পথে প্রচুর কুকুর দেখা যায়। বিশালাকার লোমশ পাহাড়ি কুকুরগুলো দেখতে ভয়ানক হলেও আচরণে ভালো। ঘেউঘেউ দূরে থাক, মেউ মেউ'ও করে না।
বোট হাউজ থেকে পুরো ডাল লেক দেখা যায়। কিন্তু এসব বোট হাউজে একদিনের বেশী থাকার কোন মানেই হয় না। অনেক ব্লগে বোট হাউজের যতো আজাইরা প্রশংসা শুনেছি সেই অনুযায়ী আমার কাছে তেমন ভালো লাগে নি। কাপল গেলে এসব বোট হাউজে না উঠাই ভালো। কারণ একটু জোরে হাটলেই বোট হাউজ দোলতে থাকে। 
আবার এসব বোট হাউজের মালিকেরা সবাই প্যাকেজ ট্যুর অফার করে। ভুলেও নিবেন না। এঁদের এইসব অফার থেকে বেচে থাকাটা কাশ্মীরের একমাত্র চ্যালেঞ্জ। কাশ্মীর ভ্রমণ ব্যয়বহুল হয়ে যায় এঁদের প্যাকেজের কারণেই। আমরা রীতিমতো যুদ্ধ করে আমাদের বোট মালিকের অফার ফিরিয়ে দিয়ে পরেরদিন গেট নং ২ এর পাশে হোটেল তুলি'তে উঠলাম। অসাধারণ রূম মাত্র ৯০০ রূপিতে। ৩ জন অনায়াসে থাকা যাবে, তবে মেসে থাকার অভিজ্ঞতা থাকলে ৪ জনও থাকতে পারবেন। সেক্ষেত্রে অবশ্য সবাইকে একই জেন্ডারের হতে হবে। 
শ্রীনগরে দেখার মতো ডাল লেক ছাড়া কয়েকটি বাগান আছে যেগুলা সম্রাটরা বানাইছিলেন মূলত ''হেরেম" হিসেবে। এগুলা দেখার চেয়ে আমাদের বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখা ২০৫ গুণ ভালো। তবে হযরতবাল দরগাহ দেখে আসুন। ওটা একটা মসজিদ যদিও, কিন্তু ছেলে মেয়ে সবাই ঢুকতে পারে। অটোতে করে ডাল লেক থেকে ১৫০ রূপি করে নিবে। একটা অটোতে ৪ জন আরামসে বসা যায়।
শুধু শ্রীনগরের নয়, পুরো কাশ্মীরের খাবার খুবই টেস্টি। এদের ভাতগুলো লম্বায় ছোটখাটো খাম্বার সমান। দাম কক্সবাজারের চেয়েও কম। ঘুরতে গেলে পেটপুরে খাওয়ার নিয়ম। তাই খাবেন প্রচুর। আর খাওয়ার জন্য শ্রীনগরের লেকের পাশের রেস্টুরেন্টগুলোই ভালো, চাইলে ''লালচক"ও যেতে পারেন।
শ্রীনগরে একটা বাজারে সেদিন স্বাধীনতাকামীরা হামলা চালাইছিলো পুলিশের উপর। তাই দুইবার চেকিং-এর মুখোমুখি হইছিলাম। যেখানেই শুনে ট্যুরিস্ট, সাথে সাথে পুলিশের ব্যবহার হয়ে যায় অমায়িক। রাগী পুলিশও আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে "কেমন লাগলো কাশ্মীর?" যেন আমাদের মুখের হাসিটাই এঁদের একান্ত কাম্য। এছাড়াও সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি নিয়ে পুলিশী পাহারা চোখে পড়বে কাশ্মীরের সর্বত্র, যেন এখুনি যুদ্ধ শুরু হচ্ছে। ভয় নেই। আমার বিশ্বাস কাশ্মীর দুনিয়ার সবচে নিরাপদ ট্যুরিস্ট স্পট।
যাতায়াতের জন্য আমরা শেয়ারিং জীপ কিংবা মিনিবাস কিংবা অটো ব্যবহার করেছি। এতে যাতায়াত খরচ ১০ ভাগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি লোকাল কাশ্মীরিদের সান্নিধ্য পাওয়া গেছে। অথচ যাতায়াত রিজার্ভ জীপের মতোই আরামদায়ক ছিলো।
কাশ্মীরি মেয়ে বিয়ে করার শখ সেই ছোটবেলা থেকে। এক দেশী কাশ্মীরী আগেই আমারে পটায়া বিয়ে না করলে একটা চান্স নিতাম। শুনেছিলাম এরা রূপসী হয়। শ্রীনগর ঘুরে এমন শতশত কাশ্মীরী মেয়ে দেখলাম যারা একেকজন ক্যাটরিনা কিংবা জাহেদা। অনন্তনাগের একটা গার্লস স্কুলের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে জ্ঞান হারানোর দশা হইছিলো। পুরো কাশ্মীরে প্রায় ২০-২৫ জনের উপর সিরিয়াস টাইপের ক্রাশ খাইছি কিন্তু কেউই বুঝে নাই 😎😎। লোকাল মিনিবাসে এমনই এক মেয়ের সাথে পরিচয় হইছে, নাম মেহেক। তার মা বাঙালি। মেয়েটাকে নাকি বাংলাদেশে এক ছেলে "আমি তোমাকে ভালোবাসি " বলেছিলো। সে তখন একেবারেই বাংলা জানতো না, তাই ''হ্যা" বলে দিয়েছিলো। আমি শুনে হাসতে হাসতে "আমিও ভালবাসি" বলেছি। মেহেকের ছবি তুলেছি, কিন্তু ফেসবুকে দেয়া যাবে না এমন শর্ত ছিলো। 

এছাড়া শ্রীনগরের পথে পথে শতশত নায়কও ঘুরে বেড়ায়। এদের কেউ কেউ ট্রাক ড্রাইভার, কেউবা বাসের হেল্পার, কেউ আবার রাস্তার ধারে ভূট্টা বিক্রি করে।
কাশ্মীরকে শুধুমাত্র এর সৌন্দর্যের জন্য "ভূস্বর্গ" বলা হলে সেটা অতি অবশ্যই ভুল। কাশ্মীর ভূস্বর্গ হয়েছে সেখানকার মানুষের ব্যবহারের কারণে। যখনি এরা বুঝবে যে আপনি অতিথি, তাও আবার বাংলাদেশ থেকে; আপনাকে খুব সমীহ করবে। নিজে থেকে যেচে কথা বলার মতো এতো আন্তরিকতা দুনিয়ার আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই। মুসলিম পরিচয় পেলে আরো খুশি হয়। কাশ্মীরের লোকজন যথেষ্ট গরীব হলেও এঁদের ব্যক্তিত্ব আপনাকে মুগ্ধ করবে। রাস্তাঘাট যথেষ্ট পরিষ্কার। অযথা গাড়ীর প্যাঁ প্যাঁ নেই। শহরের বাড়ীগুলোর ডিজাইন দেখলে মনে হবে এরা বুঝি সবাই কোটিপতি। একটা বাড়ী থেকে অন্যটার যথেষ্ট দূরত্ব আছে। এসব দেখে আমার মতো আপ্নারও থেকে যেতে মন চাইবে বিপদজনক এই উপত্যকায়।

******* প্রথম ইন্টারমিশন ******
পরদিন শ্রীনগরের ডাল লেকের সামনে থেকে আমরা দুজন অটোতে ১০০ রূপি দিয়ে চলে গেলাম "পারিমপুরা" বাস স্ট্যান্ড-এ। সেখানে শেয়ারিং জীপ ড্রাইভার গলা ফাটায়া ডাকতেছে "ট্যানমার্গ"। একজন ৭০ রূপি করে। ড্রাইভারের পাশে দুজনে বসে স্বর্গ দেখতে দেখতে ৩০/৪০ মিনিটেই চলে এলাম (Tanmarg) ট্যানমার্গ।
সেখান থেকে আবার শেয়ারিং জীপে ৪০ রূপিতে ''Gulmarg"! এই শেয়ারিং জীপ খুবই এভেইলেবল এবং কমফোর্টেবল। আমাদের শেয়ারিং জীপে শুধু আমরাই ছিলাম। অথচ রিজার্ভ নিলে খরচ হতো ১৫০০/- রূপি! তাই শুধু মনে রাখতে হবে বাসস্ট্যান্ড এর নামগুলো। সামান্য এই তথ্যগুলা না জানার জন্য বেশীরভাগ টুরিস্ট যাতায়াতে রিজার্ভ জীপের জন্য খরচ হয় অস্বাভাবিক বেশী। তাছাড়া আগেও বলেছি, শেয়ারিং জীপে স্থানীয় লোকজন (মেয়েরাও  ) উঠে।
ট্যানমার্গ থেকে গুলমার্গ পাহাড়ী উঁচু রাস্তা। পুরো রাস্তার দু ধারে সাদা ডেইজী কিংবা নাম না জানা বাহারি ফুলের কারপেট বেছানো। গুলমার্গ ঢোকার ঠিক আগে পুলিশী চেক পয়েন্টে ট্যুরিস্ট পরিচয় দিলেই রাজকীয় অভ্যর্থনা মিলবে।
গুলমার্গ বাস স্ট্যান্ডের বাম পাশেই গন্ডোলা রাইড, মানে ক্যাবল কার। এগুলো সরকারি এবং খরচ পুরো রাইডে ১৭০০ রূপি। অর্ধেক চড়লে ৯৫০ রূপির মতো। খরচ অবশ্যই অস্বাভাবিক বেশী। এরচে নন্দন পার্ক এর কেবল কারে চড়া আরামদায়ক। আমরা গন্ডোলায় না চড়ে ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ের উপর যেখানে গন্ডোলায় করে লোকজন যায়, সেখানে গিয়েছি। ঘোড়ায় চড়াকে স্থানীয় ভাষায় বলে ''পনি রাইড"! ঘোড়াওয়ালারা গরীব এবং শুধুমাত্র গ্রীষ্মকালেই ওদের আয় হয়। তাই সরকারকে টাকা না দিয়ে ঘোড়ায় চড়াই বুদ্ধিমানের কাজ। একটা ঘোড়ায় একজন বসতে পারে আর ভাড়া ৪০০-৭০০/- রূপি। এইটার একমাত্র সাইড ইফেক্ট হচ্ছে পাছা ব্যথা হওয়া। হয়ত এক্সট্রিম এডভেঞ্চার নিতে গিয়ে আগামী দুইদিন সোফায় বসলেও "আউচ" বইলা চিক্কার দিতে পারেন আরকি! 
আমরা প্রথমে ভুল করে ডান পাশের গ্রাম্য রাস্তায় হাটতেছিলাম স্থানীয় কিছু পরিবারের সাথে। একটা পিচ্চি মেয়েকে নাম জিজ্ঞেস করলাম। বললো, সাহির মালিক! মিষ্টি মেয়েটার নাম শুনেই বলে ফেললাম "আয়াম ইন লাভ"! আর অমনি ওর মা অথবা বোন এসে ওকে নিয়েই ভো-দৌড়। নগদ ছ্যাকায় মন খারাপ হইছিলো খুব! 
গুলমার্গের যে পাহাড়ে আমরা উঠেছিলাম তার উপারেই পাকিস্তান। পাহাড়ে মেঘের সারি, হুট করে বৃষ্টি, ঠাণ্ডা শীতলকরা বাতাস, ভেড়ার পালের চড়িয়ে বেড়ানো সবকিছুই অসাধারণ। এখানে ছবি তুলে প্রোফাইল পিকচার দিলে যারা লাইক পায় না তারাও শতাধিক লাইক পাবে, গ্যারান্টি। 
পাহাড়ের চূড়ায় আমরা কাশ্মীরী বিরিয়ানি খেয়েছি মাত্র ১৫০/- রূপিতে, সাথে নুডুলস ৮০/- রূপি। এতো টেস্টি বিরিয়ানি আর নুডুলস কাশ্মীর আর স্বর্গ ছাড়া কোথাও পাওয়া যাওয়ার কথা না। পাহাড় থেকে নামার সময় "লিটল চেরি" নামের ভিটামিন এ ক্যাপসুলের মতো লালচে ছোট ফল পেয়েছি। আলকাতরার চে যেহেতু ভালো এবং ফ্রি ইচ্ছামত খেয়ে নিন। খেলে যৌবন স্থায়ী হবে। (নিজস্ব গবেষণা, খাইয়া পাগল হইলে কর্তৃপক্ষ দায়ী না)! 
পুরো গুলমার্গ যেন ফুলের বাগান। বাগানের উপরে মেঘেদের বিচরণ। এখানে ঠাণ্ডা থাকে সারাবছর। তাই শীতের কাপড় নেয়াটা সার্থক ছিলো। পাহাড়ের চূড়ায় একটু পরপর বৃষ্টি হয়। ওখানে একটা "সেভেন ওয়াটার ফল" কানেকশন আছে। পানি হাতে নিয়ে "তাজ্জব হয়ে গেলুম!" অস্বাভাবিক এবং অবিশ্বাস্য ঠাণ্ডা। এই পানি সবারই ছুঁয়ে দেখা উচিৎ! (লেজকাটা শিয়ালের গল্পের কথা বলতে আসবেন না, হুহ)
গুলমার্গে না থেকে সেদিনই ফিরে আসি আমরা। ফিরতি গাড়ী সন্ধ্যা ৬ টা অব্দি এভেইলেবল।


******* দ্বিতীয় ইন্টারমিশন ****** 
পরদিন সকালে বাক্সপেটরা নিয়ে রওনা দেই ৬৬ কিলোমিটার দূরে পেহেলগামের উদ্দ্যেশ্যে।
এবার ডাল লেক থেকে ৬০ রূপি দিয়ে অটোতে করে "লালচক বাস স্ট্যান্ড" -এ গেলাম। সেখান থেকে শেয়ারিং জীপে ৮০/- রূপিতে গেলাম "অনন্তনাগ"! সেখান থেকে ৬০ রূপিতে সরাসরি পেহেল্পগাম। কাশ্মীরের সবচে সুন্দর জায়গা।
শেয়ারিং জীপে যাওয়ার পথে মোজাফফর নামে এক ইয়াং স্থানীয় স্কুল শিক্ষক খুব ভালো ইংরেজিতে আলাপ জুড়ে দিলেন। আমরা শেখ হাসিনাকে কেন ভোট দেই এইটা নিয়া মন খারাপ করলেন। আমি তাকে বুঝায়া দিছি যে আমাদের দেশ ডিজিটাল, এইখানে ভোট দেয়া লাগে না। ভদ্রলোক হাসেন। আমি বললাম, আপনাদের মূখ্যমন্ত্রী তো মুসলমান! উনি বলেন, তাতে কি? সে তো ভারতীয় দালাল। নামেই শুধু মুসলমান। শুধু মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়। রাজনীতি যারা করে তারা সবগুলাই এমন। এবার আমি হাসি।
এরপর উনি একটা বাজার দেখালেন যেখানে কিছুদিন আগেই একসাথে ৪০ জন স্বাধীনতাকামীকে হত্যা করেছে ভারতীয় বাহিনী। অনেক কিছুই নাকি মিডিয়ায় আসে না। 
আসার আগে উনি আমাদের জোর করে বেশকিছু কাজু বাদাম আর চকলেট দিলেন। অনেক সুস্বাদু ছিল বলে সব সাথে সাথেই খেয়ে ফেলেছি। এখন আর আপনারা চাইলেও দিতে পারবো না। 😁😎
পথে যেতে যেতে চোখে পড়লো সারি সারি আপেল গাছ। আপেল ভালো করে পাকে নাই। নইলে কয়েকটা লুকায়া বাংলাদেশে নিয়া আসতাম। আপ্নারাও খাইতে পারতেন। 
রাস্তার পাশেই লিডার নদী আর পেহেলগাম নদী। খুব বড় না, কিন্তু পানির রঙ নীল প্রচুর স্রোত। নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাথর। কিছু কিছু পাথর এতো বড় যে ছুড়ে মারলে যে কারো ভেঙে যাবে। 
বাস স্ট্যান্ডের পাশেই অনেক হোটেল। আমরা উঠলাম হোটেল এক্সিলেন্টে। ভাড়া ৮০০ রূপি, কোয়ালিটি ৭ স্টার! (বিশ্বাস না করলে নাই)  পুরো হোটেল কাঠের আবরণ দেয়া। ফ্লোরে কার্পেট। জানালা দিয়ে নদী পাহাড় বাগান ফুল হেলিকপ্টার সবই দেখা যায়! 😍 এই কোয়ালিটির পাহাড়ী রিসোর্ট-এ বান্দরবানে থাকতে প্রতিরাত ১০০০০/- দিয়েও হবে না।
পেহেলগামে ঘুরার জন্য আছে "আরু ভ্যালি, বেতাব ভ্যালি, চন্দনওয়ারী, বাইসারান!" এতোসব জায়গা না ঘুরে ঘোড়ায় করে ৪০০/- রূপি দিয়ে কেবল বাইসারান ঘুরলেই হলো। বাইসারানকে মিনি সুইজারল্যান্ড বলা হয়। অনেক বিখ্যাত সিনেমার শ্যুটিংস্পট এই জায়গা। আমি তখন ভাবি এইখানে আসায় নায়িকাদের পাছার কি হাল হইছিলো।  আমরা বাইসারান গিয়েছিলাম, যাবার পথেই পড়বে আরু ভ্যালি, বেতাব ভ্যালী এইসব স্পট। ঘোড়াওয়ালারা আপনাকে বলবে প্রতিটা স্পট ঘুরিয়ে আনবো ৫০০/- করে। এটা একটা ভাঁওতাবাজি। আপনি শুধু বাইসারান ঘুরবেন, বাকি স্পটগুলা অটোমেটিক চলে আসবে! 
কাশ্মীরের ভাষা কাশ্মীরি। আমাদের ঘোড়ার পাইলট কাশ্মীরি, উর্দু আর ইংরেজি মিলিয়ে কথা বলে। আমি বাংলা, হিন্দী আর ইংরেজী মিলিয়ে কথা বলি। সবাই সবার ভাষা বুঝি। 😁😎
পেহেলগামের বিভিন্ন স্পট ঘিরে খুবই গরীব পরিবার দেখা যায় যারা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে খুপরি ঘর বানিয়ে থাকছে। অথচ তাদের পোশাকাদি ভালো। ব্যক্তিত্ব অসাধারণ। ছোট ছোট বাচ্চারা কিউট খরগোশ হাতে নিয়ে রিকুয়েস্ট করবে ছবি তোলার জন্য। বিনিময়ে ১০ রূপি থেকে ১০০ রূপি যা খুশি দিবেন, ওরা খুশিতে লাফাবে।
তবে আমার কাছে পেহেলগামের মূল শহরটা, মানে বাস স্ট্যান্ডের সাম্নের জায়গাটাই অসাধারণ লেগেছে। লিডার নদী এবং পেহেলগাম নদী দুটি এক হয়ে মিশে গেছে আমাদের হোটেলের সামনেই। অবশ্য এই নদীগুলোকে বরিশালের লোকজন খাল বলে ইনসাল্ট করতে পারে। তাদের কথায় মোটেও কান দেবেন না। এসব নদীর উপর দিয়ে ব্রিজ আছে কয়েকটি। ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলা একটা মহান কাজ হতে পারে। কারণ এসব ছবি হতে পারে আপনার নেক্সট পাচ বছরে ফেবুর প্রোপিক আর কাভার ফটো!  আলোচিত দুই নদীর মাঝখানে আবার ফুলের বাগান। সেখান থেকে হাতছানি দেয় থরে থরে সাজানো পাহাড়ের সাড়ি, তার উপর জমে থাকা সাদা বরফ! পাথরের উপর বসে পাহাড়ী আপেল আর পাকা টসটসে আলু বোখারা খাচ্ছিলাম! জান্নাত বুঝি একেই বলে!
নদীর ধার ঘেঁষে আমরা হাটছিলাম সেদিন বিকেলে। এক পাশে ব্যারিকেড দেয়া। সেই ব্যারিকেড টপকে উপারে গিয়ে পাকিস্তানে যাওয়ার ফিলিংস আসছিলো। নিজেরে যখন বজরংগী ভাইজান লাগতেছিলো তখনি এক পুলিশ এসে ২০+২০ রূপির একটি টিকেট ধরিয়ে বললো এটিও বাগান।
কাশ্মীরে গেলে পেহেলগামের জন্য দুইটি রাত বরাদ্দ রাখা উচিৎ। যেহেতু হোটেল একেবারেই এভেইলেবল এবং ভাড়াও খুবই কম, প্রকৃতির সব রস এখান থেকেই নিয়ে আসা যায়।
কাশ্মীর যাবেন বিমানে। অন্তত কোলকাতা থেকে দিল্লী হয়ে শ্রীনগর যাবেন বিমানে, আসবেনও বিমানে। কারণ দীর্ঘ পথ ট্রেনে বিরক্ত লাগবে, আর দুই মাস আগে টিকেট কাটলে বিমানের ভাড়া ট্রেনের ভাড়ার প্রায় সমানই পড়ে। আমাদের দুজনের বিমানে যাওয়া আসা, থাকা-খাওয়া, সাইট সিয়িং খরচ মিলিয়ে ৫০০০০/- হইছে। এরমধ্যে যখন তখন যা খুশি খাওয়া, একেবারে ছোটখাটো সব খরচা, ট্রাভেল ট্যাক্স সবই অন্তর্ভুক্ত।
আমি শুরুতেই বলেছি আবার যাবো কাশ্মীর। এরপরে যাবো শীতে বরফ আর তুষারপাত দেখতে। কারণ কাশ্মীরের রূপ তখন একেবারেই পালটে যায়। প্রায় সর্বত্র বরফে ঢাকা থাকে। সেক্ষেত্রে অবশ্য স্পট কমিয়ে ফেলে খরচ আরো কমানো যায়!
এবার আপ্নাকেও রিকুয়েস্ট করতেছি একবারের জন্য হলেও টাকা জমিয়ে, সময় করে ঘুরে আসুন ভূস্বর্গ কাশ্মীর!
এখন কথা হচ্ছে, সবই তো ঘুরলেন। কিন্তু কাশ্মীর কই?
আসলে বাংলাদেশ ঘুরতে এসে যেমন কেউ বাংলাদেশ পাবে না তেমনি কাশ্মীর গিয়েও কাশ্মীর পাবে না। শ্রীনগর হচ্ছে কাশ্মীরের ঢাকা। গুলমার্গ, সোনমার্গ, পেহেলগাম, দুধপাত্রী এসব হচ্ছে মূল স্পট।
*টিকা- কাশ্মীর গেলে কখনওই আগে থেকে হোটেল/ বোট হাউজ বুকিং দেবেন না। আর সবার সাথে ভালো আচরণ করবেন।
* যেভাবে যাবেন-আসবেন-
প্রথমে বাই রোডে সরাসরি কোলকাতা চলে যাবেন ঢাকা থেকে। ইমিগ্রেশনে জিজ্ঞেস করলে বলবেন দিল্লি যাবেন। নইলে ভাববে টাকা আছে অনেক। 
সেখান থেকে বিমানে যাবেন দিল্লী। দিল্লী থেকে ট্রেনে যাবেন জম্মু। সেখান থেকে শেয়ারিং জীপে যাবেন অনন্তনাগ। অনন্তনাগ থেকে যাবেন পেহেলগাম। এখানে থাকবেন এক/দুদিন। এখানে ঘুরাঘুরি শেষে যাবেন শ্রীনগর, শেয়ারিং জীপেই। শ্রীনগরের ডাল লেক এলাকায় থাকবেন রাতে। পরদিন সকালেই চলে যাবেন পারিম্পুরা বাস স্ট্যান্ড এ। সেখান থেকে শেয়ারিং জীপে চলে যাবেন ট্যানমার্গ। সেখান থেকে আবারো শেয়ারিং জীপে যাবেন গুলমার্গ।
গুলমার্গে শুধু গন্ডোলা রাইডে চড়তে পারেন অথবা পনি রাইড মানে ঘোড়ায় চড়ে ফেইজ এক অব্দি যেতে পারেন। ঘোড়ার ভাড়া নিবে ২৫০/- রূপি থেকে ৩০০/- রূপি। চাইবে ১৫০০ রূপি!!
মাঝখানে দালালরা মাথা খারাপ করে দিবে যা খুবই বিরক্তিকর। তাদের কথায় কান দেবেন না। ভুলেও প্যাকেজ নিবেন না। হাউজ বোটে থাকবেন শেষের এক রাত। এরপরে ফিরবেন এয়ারপোর্ট, সেখান থেকে দিল্লী, সেখান থেকে কোলকাতা। তারপর ঢাকা। কাশ্মীর দেখা হয়ে গেলে ইন্ডিয়ার আর কোথাও ঘুরবেন না। বিরক্ত লাগবে।

No comments:

Post a Comment