Friday, 18 October 2019

সেন্টমার্টিনের ব্যার্থ যাত্রা

এক বুক আশা নিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইছিলাম। সেন্টমার্টিন যেহেতু গরীবের পাতায়া সেহেতু এসি বাসে যাওয়ার নিয়ম। যথারীতি আমিও "তওবা লাইনের" দোতলার সমান একতলা এসি বাসের টিকেট কেটে রাত ৮ টায় যাত্রা শুরু করলাম। কিন্তু বাসের সীট এতো শক্ত ছিল যে সকাল ৮ টায় উঠে আবিস্কার করলাম আমার পাছা প্যারালাইজড হয়া আছে। চিমটি দিলেও কিচ্ছু অনুভুতি আসে না। ভাব নিতে গিয়া এসি বাসের টিকেট কাইটা ১ হাজার এক্সট্রা খরচ কইরা মন খারাপ লাগতেছিল।
টেকনাফে গিয়া দেখি বিশাল মহাসমাবেশ। লক্ষ লক্ষ লোক জড়ো হইয়া আছে। সবাই সেন্টমার্টিন যাইতে চায়। সমস্যা হইল জাহাজের টিকেট নাই। কিন্তু বরিশাল থেকে আগত লোকজন বলতেছে, মোরে ইস্ট্যান্ডিং টেকেট দেলেও চলবো। হেলে মুই লঞ্চের ছাদে উইডা যাইমু।
আমি উনাদের বললাম, ভাই এইগুলা লঞ্চ না জাহাজ।
আমি ঘন্টাখানেক "লঞ্চে"-র টিকেট খুজে হতাশ হইলাম। এমন সময় জনৈক ব্যাক্তি আইসা ১৬০০/- টাকার বিনিময়ে স্ট্যান্ডিং টিকেট দিতে চাইলো। এই টাকায় ট্রলারে ডাইরেক্ট মালদ্বীপ চইলা যাওয়া যায়। তাই বাদ দিলাম। ছুটলাম টেক
নাফ শহরের দিকে। উদ্দেশ্য রোহিঙ্গা স্টাইলে মাত্র ২০০/- দিয়া ট্রলারে কইরা সেন্টমার্টিন যাওয়া।
ট্রলার ঘাটের পাশে গিয়া দেখি আরেক মহাসমাবেশ। তবে এইখানে মেয়ে মানুষ কম। যারা আছে তারাও দেখতে ছেলেদের মতো কিংবা তারা নিজেদের ছেলেদের চেয়েও উপ্রের কিছু ভাবে। ছোটো ছোটো ট্রলার ভর্তি গাদাগাদি করে লোকজন বসে আছে। ট্রলার ভর্তি হতে সময় লাগছে না। রোহিঙ্গারা কিভাবে বাংলাদেশে আসছে এই দৃশ্য দেখে কিছুটা আইডিয়া হইছে। এই দীর্ঘ পথ ট্রলারে পাড়ি দিতেও আপত্তি ছিল না আমার। সমস্যা হইছে প্রচন্ড রৌদ্র।
এক কলা বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই এই ট্রলার সেন্টমার্টিন যাইতে কত সময় লাগতে পারে?
ভদ্রলোক অনেকক্ষণ ধরে অনেককিছুই বললেন। তার কথা আমি তেমন একটা বুঝি নাই। পরে বললাম, আপনি অল্প কিছু বাংলা মিশায়া আবার বলেন। ভদ্রলোক উনার সবগুলো দাত বের করে আগের চেয়ে আগ্রহ নিয়ে যথাসম্ভব আকারে ইংগিতে যা বললেন তার সারকথা হলো এই ট্রলার সেন্টমার্টিন পৌছাতে ৫ ঘন্টার মতো সময় নেয়। মাঝপথে ঢেউ হলে "এইভাবে" দুলতে থাকে বলেই লোকটা নিজেই দুলতে থাকলো কিছুক্ষণ। আমি উনার দুলুনি দেখে সেন্টমার্টিন যাওয়ার চিন্তা বাদ দিলাম।
তাইলে এখন বলি কেন হুট করে সেন্টমার্টিন যাইতে চাইলাম?
কারণ, আগামী মে মাসের পরে ওই দ্বীপে রাত্রীযাপন নিষিদ্ধ হচ্ছে। একবছর শুধুমাত্র সকাল সন্ধ্যা ঘুরা যাবে। ধীরে ধীরে ওইখানে ভ্রমণও নিষিদ্ধ হবে পরবর্তী ১০০ বছরের জন্য। মানে হইলো আপ্নার নাতি বড় হইয়া যাইতে পারবে। বংশের মান রাখতে চাইলে দ্রুত ঘুইরা আসেন।
এইবার বলি গতবারের অভিজ্ঞতা। আসলে সেন্টমার্টিনের সাথে ইনানী বীচের তেমন কোন পার্থক্য নাই। সেন্টমার্টিনে প্রচুর প্রবাল পাবেন যেটা ইনানীতেও দেখা যায়। সেন্টমার্টিন জাহাজে করে যাওয়াটা খুব এক্সাইটিং ব্যাপার। আর ভোরে উঠতে পারলে স্পীড বোট নিলে সূর্যোদয় দেখবেন। এই দৃশ্যটা দুনিয়ার সবচে আকর্ষণীয় মনে হবে নিশ্চিত থাকেন। এছাড়া আর যা পাবেন তার সবই কক্সবাজারেই আছে। বরং কক্সবাজারে কিছু বেশীই আছে! 
তো, এরপরে আমি কক্সবাজার ফেরত আসতে চাইলাম। টেকনাফ থিকা এর দূরত্ব মাত্র ৭৫ কিলোমিটার! কিন্তু পুরাটা রাস্তা দেইখা মনে হইলো মিয়ানমারের নাসাকা বাহিনীর সাথে একটু আগে বাংলাদেশ যুদ্দ কইরা রাস্তাটা উদ্ধার করছে। তারচে বড় কথা চেকিং। কমপক্ষে ১০ বার চেকিং হইছে আমাদের বাস। আইডি কার্ড দেখতে চায়। আমার পেছনে বসা দুজন মহিলার আইডি কার্ড দেখেই বুঝা গেছে ওগুলো জাল। কিন্তু পুলিশ ভাইয়েরা ওই জাল আইডি কার্ড দেখেই খুশি।
পাসের সীটে বসা এক লোককে একটা চেকিং পয়েন্টে পুলিশ নাম জিজ্ঞেস করাতে সে কিছুক্ষণ ভেবে নাম বললো। বাবার নাম জিজ্ঞেস করাতে আর বলতে পারলো না। নিজের জেলার নামও ভুলে গেছে। কিন্তু পুলিশের বোধহয় কাউকে আটকের মুড ছিলো না কিংবা আটক করে লাভও নেই।
শেষের চেকিং-এ একটা বাচ্চা পুলিশ আমাকে জিজ্ঞেস করলো কই যাবো, কই থেকে আসছি এইসব। কিন্তু ট্রলারের দুলুনির কথা মনে পড়ায় আমি ভুলে গেছিলাম কই যাবো, কই থেকে আসছি। পাশেরজন মনে করায়া না দিলে হয়ত এতক্ষণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চইলা যাইতাম।
প্রায় ৩ ঘন্টার বিরক্তিকর যাত্রার পরে কক্সবাজার আসলাম। হিমছড়ি গিয়ে বিশাল বীচের সামনে কিছু ছবি তুলে সেইটাই সেন্টমার্টিন হিসেবে ফেসবুকে চালায়া দিছিলাম। উল্লেখ্য যে কেউই অবিশ্বাস করে নাই।
সেন্টমার্টিনের কমন খাবার হচ্ছে মাছ/কাকড়া বারবিকিউ করে খাওয়া। এইটা কক্সবাজারেও আছে। কাকড়া ভাব দেখানোর জন্য খাওয়া হয়। স্যালমন কিংবা লবস্টার ভালো। রূপচাদার দাম বেশী।
২০১৬ তে সেন্টমার্টিন গিয়েছিলাম। আবারো যাবো জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারিতে। সপ্তাহের মাঝামাঝি, যখন কোন সরকারি ছুটি নাই তখন।
কাউকে কিচ্ছু বলবো না।

No comments:

Post a Comment