Tuesday, 29 October 2019

দিল্লী, তাজমহল ও মাথুরা ভ্রমণ

পেহেলগাম থেকে আমরা শেয়ারিং জীপে জম্মু আসতেছিলাম। দূরত্ব ২৮০ কিলোমিটার প্রায়। আসার সময়ে টের পেয়েছি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কতটা উপরে ছিলাম গত পাঁচদিন। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা, রাস্তার ধারেই আপেল আর আলুবোখারার গাছ। পাহাড়ের গা বেয়ে পিঁপড়ার মতো ধীরেধীরে নেমে আসা! আগে এসব রাস্তা রিস্কি থাকলেও এখন অনেক নিরাপদ। পথে বেশকিছু টানেল দেখলাম। যখন ভেতরে যায় একেবারে অন্ধকার দেখা যায়। নেহরু টানেল ৯ কিলোমিটার লম্বা। মানে পাহাড়ের বুক ফুটা কইরা চলে গেছে ওইপাশে। এখন অবশ্য পাহাড়ধ্বস হয় খুবই কম। এসব দেখতে দেখতে ৭/৮ ঘন্টা পর যখন জম্মু রেলস্টেশন আসলাম তখন মনে হচ্ছিলো জান্নাত থেকে কোন একটা অপরাধের জন্য আল্লাহ্‌ শাস্তি হিসেবে দুনিয়ায় না পাঠিয়ে ডাইরেক্ট জাহান্নামে পাঠিয়ে দিছেন।
জম্মুর নোংরা রেলস্টেশন, তারচে নোংরা বাথরুম। তাছাড়া কাশ্মীরের নায়ক-নায়িকাদের দেখতে দেখতে চোখ এমন এলিট হইছে যে, জম্মুর প্রায় সব মানুষকেই তেলেগু সিনেমার সাইড ভিলেন লাগতেছিলো।
"শালিমার এক্সপ্রেস"-এ আমরা রাত ৮.৩০ এ রওনা হয়ে দিল্লী পৌছলাম পরদিন সকাল ১০ টায়। এসে আরো বেশী মন খারাপ লাগতেছিলো! তীব্র গরমে মনে হচ্ছিলো হাশরের মাঠে দাঁড়িয়ে আছি। মাথার মাত্র এক হাত উপরে সূর্য। অবশ্য দিল্লী থেকে সূর্যের দূরত্ব এমনিতেও কম। দিল্লী জামে মসজিদের কাছেই হোটেল ওয়েসিসে উঠলাম দুজন। ৯০০/- রূপি ভাড়া। এসি আছে, কিন্তু নষ্ট!
ফ্রেশ হয়ে দিল্লী জামে মসজিদে ঘুরতে গেলাম। বায়তুল মোকাররম টাইপের মসজিদ। এইটাকে ঘিরে মার্কেট। একপাশে প্রচুর খাবারের দোকান। স্ট্রিটফুড হিসেবে ভালোই লাগছে। সবচে ভালো লাগছে জিলাপি আর মিষ্টি। কারো খেতে ইচ্ছে করলে ইনবক্সে নক করবেন, টাকা লাগবে না। গরম গরম জিলাপির ছবি তুলে এনেছি। 
রাতে গেলাম বিখ্যাত দিল্লী গেট!
গিয়ে মন আরো খারাপ হলো। এই গেটের চেয়ে আমাদের বাসার গেট আরো সুন্দর আর বড়। কিন্তু হঠাৎ স্মৃতি ফিরে পাবার মতো "ইন্ডিয়া গেট" নামটা মনে পড়লো। দিল্লী গেট থেকে ৬০ রূপি অটো ভাড়া দিয়ে চললাম ইন্ডিয়া গেট! একেবারে হতাশ না হলেও আহামরি কোন স্থাপনা মনে হয়নি! কিন্তু প্রচুর ট্যুরিস্ট আর রোমান্টিক কাপল।
দিল্লীতে কুতুব মিনার, লোটাস টেম্পল আছে কাছাকাছি দূরত্বে। দিল্লী আর নয়াদিল্লী হচ্ছে পুরান ঢাকা আর গুলশান!
পরদিন আগ্রার একটা প্যাকেজ নিলাম একজন ৪৫০/- রূপি করে। এসি বাস। যাওয়াআসা, সাইট সিয়িং এই টাকার মধ্যে। দিল্লী থেকে আগ্রা ২৫০ কিলোমিটার হিসেবে এই টাকা খুবই কম।
আগ্রা গিয়ে প্রথমেই দেখলাম "আগ্রা ফোর্ট"! এইখানে সম্রাট শাহজাহানের আব্বু থাকতো, পরে শাহজাহান, তারপরে তার ছেলে। এইটা বিশাল মুঘল সাম্রাজ্যের "প্রধান কার্যালয়"ও। ঢুকতে বিদেশীদের জন্য ৫৫০/- রূপি! কিন্তু আমরা যেহেতু দিল্লীর অধীনে তাই নিজেকে বিদেশি না ভাইবা ৪০/- রূপি করে দুজনের ৮০/- রূপি দিয়ে দুটি টিকেট কেটে ঢুকলাম। আগ্রা ফোর্ট থেকে যমুনা নদীর তীরে তাজমহল দেখা যায়। আমাদের সাথে প্রচুর সাদা চামড়ার সত্যিকার বিদেশি ছিলো, তারাই আমার যতো আনন্দের মূল ছিলো। 😎
দুপুরে খাবারের বিরতী!
খাবার ভালো না। তবুও হাসিমুখে খাচ্ছিলাম। জাহান্নামে খাবার পাওয়া গেছে এতেই শুকরিয়া! 
এরপরে গেলাম তাজমহল। এখানেও টিকেট ৫৫০/- রূপি করে। কিন্তু আমি ঢুকলাম ৪০+৪০, দুজনে ৮০/- রূপি দিয়েই। ঢুকার সময় আইডি কার্ড চাইছে। আমি শুদ্ধ জাপানী ভাষায় বলেছি,"ওয়াশি আন্নু নাতাশিমা" "(বংগানুবাদ--আইডি আনি নাই)।" গার্ড কি বুঝেছে কে জানে। বললো, যাঈয়ে! অবশ্য আমিও জানিনা এই কথার মানে! 😜
ভিতরে গিয়ে খুব হতাশ হইছি! ছবিতে তাজমহলকে যতোটা মোহনীয় লাগে বাস্তবে তার ১০%ও সুন্দরী না। তারচে ভালো লাগচতেছিলো কোরিয়ান ওই ট্যুরিস্টদের। সবগুলা কেমন পুতুল পুতুল! চল্লিশ টাকা টিকেটের এইখানেই জাস্ট ৬৯% উসুল হইছে।
হাটতে হাটতে একদম ভেতরে গেলাম। খালি পায়ে যেতে হয়। ভিতরে গিয়ে দেখি একপাশে শাহজাহান আর একপাশে উনার বড় বউ বেগম মমতাজ চুপচাপ শুয়ে আছেন।
তাজমহলের একপাশে বড় একটা মসজিদ। চারপাশে চারটা পিলার আর বিশাল জায়গাজুড়ে বাগান। পিছনে নদী। তাজমহল কিভাবে সপ্তাশ্চর্য হইছে এইটা ভাইবা আমিই অস্টমাশ্চার্য হয়ে ছিলাম। জাস্ট মহামূল্যবান টাইলস (পাথর) ছাড়া ব্যতিক্রম কিছু মনে হয় নাই। আমার টাকা থাকলে আমার সবগুলা প্রেমিকারেই তাদের নিজ জেলায় একটা করে তাজমহল বানায়া দিতাম!
তাজমহল থেকে বের হবার সময় আমরা ওয়েস্ট গেটেই যাচ্ছিলাম যেখানে আমাদের বাস দাঁড়িয়ে। কিন্তু বের হবার সময় এক লোক ইস্ট গেট দেখিয়ে বললো বাস ওইদিকে। আমরা ৬০/- রূপি ভাড়া দিয়ে গিয়ে দেখি বাস ওখানে নেই। ওখান থেকে আবার ওয়েস্ট গেটে আসবো। কিন্তু সব হারামী ড্রাইভার বলে ৬ কিলোমিটার ঘুরে ওখানে যেতে হয়। ভাড়া ১৫০ রূপি। আমরা ভয় পেয়ে গেছি যে তাহলে আমাদের বাস চলে যাবে, কিন্তু বাসে আমাদের লাগেজ, ব্যাগ সব আছে। এখানে এসেই ইন্ডিয়ান মানুষদের আসল চেহারা দেখলাম। সব ফ্রড। ইচ্ছা করে সহজ ১০ মিনিটের রাস্তাটা দেখিয়ে দেয় নি। যাকগে, শেষমেশ শেষমুহুর্তে গিয়ে বাস ধরতে পেরেছিলাম।
তাজমহল ঘুরা শেষে আমাদের রিজার্ভ বাস আমাদের নিয়ে চললো "মাথুরা" জেলায়। আগ্রা থেকে ১৪৫ কিলোমিটার আর দিল্লী থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরে মাথুরা। যাওয়ার আগে আমাদের গাইড/সাধু বাসেই দেশীয় "ফেবু আলেম"-দের মতো মায়ের সেবাযত্ন নিয়ে সেই লেভেলের বক্তৃতা দিলো। বেশকিছু অলৌকিক কাহিনী বইলা আমাদের "ডর"-ও দেখাইলো। একটু পরে বুঝলাম এই মাতা ওহাদের গো-মাতা! 🐄
বাসে বোধহয় আমরা দুজনই মুসলমান ছিলাম। ওদের সাধুর বক্তৃতার মাঝেমাঝে পুরো বাসের সব যাত্রী '"জ্যায় হো" বইলা গলা ফাটায়া চিক্কার দিতো আর সাধু ধমকায়া বলতো "আজকে কিছু খান্নাই নাকি?" আমরা তখন "জয় বাংলা" বইলা চিক্কুর দিয়া রক্ষা পাইছি।
মাথুরা শ্রীকৃষ্ণ'র জন্মস্থান। ভিতরে যাইনি আমরা। খুবই কড়া নিরাপত্তা। জুতা, ঘড়ি, মানিটি কিংবা ভ্যানিটি ব্যাগ, মোবাইল কিছুই নেয়া যায়না।
সেখান থেকে রাত ১০ টায় গেলাম ''বৃন্দাবনে"! এইখানে নাকি প্রচুর লীলাখেলা হয়। ২২০ কিলোমিটার এই বনের দৈর্ঘ্য। ভিতরে আছে ৫৫০০ মন্দির। মন্দিরের লীলাখেলা রাতের আধারে বেশী হয়। রাধা-কৃষ্ণের মূর্তি ভর্তি।
রাস্তাঘাটে প্রচুর বেওয়ারিশ গরু! দুই/চাইরটা ধইরা আনার ইচ্ছা ছিলো কুরবানীর জন্য। কিন্তু বিমানের টিকেট কাটা ছিল না বলে আনতে পারি নাই।
এই গরুদের সেবাযত্ন করে গরুর মতোই বেওয়ারিশ লোকজন। তাছাড়া আছে প্রচুর বিধবা, এরাও মায়ের সেবা করে আর দুধ-হিসু-গোবর খেয়ে বাচে।
আমরা এখানকার কিছুই খাইনি। শুনেছি এরা নাকি খাবারে গোমূত্র আর "খাটি গাওয়া গোবর" মিশিয়ে দেয়।
সেখান থেকে দিল্লী ফিরতে ফিরতে রাত ৩ টা। "আশ্রমশালা" নামক একটা জায়গায় বাস নামিয়ে দিলো আমাদের। এখান থেকে দুজনে ২০০ রূপিতে আসলাম দিল্লী এয়ারপোর্ট। আসার পরে অটো ড্রাইভার বলে প্রতিজন ২০০/- রূপি! হারামিটারে ধমক দেয়ার পরে পালাইছে।
দিল্লী থেকে কোলকাতা হয়ে বেনাপোল আসলাম। বর্ডার পার হবার সময় বাংলাদেশি দুজন মিস্কিন পুলিশ দুই হাত পেতে ২০০/- টাকা চাইলো। বিনিময়ে এন্ট্রি সীল এনে দিবে। আমরা "মাফ করবেন, অন্যদিকে দেখেন" বলে নিজেরাই এন্ট্রি নিয়ে ৫ মিনিটেই চলে এলাম বাংলাদেশ!!
জয় বাংলা।

No comments:

Post a Comment