Saturday, 30 November 2019

রঙিন শহর ব্যাংকক! (নভেম্বর-২০১৯)


ব্যাংককের টিকেট কাটবো ভাবছিলাম থাই লায়ন এয়ারে। এইটা বাজেট এয়ারলাইনস হিসেবে বি-খ্যাত! অফারে মাত্র ১২ হাজারে রিটার্ন! রাত ১ টায় ফ্লাইট! ফিরতি ফ্লাইটও রাতে। আমার মতো গরীব কামলাদের জন্য পারফেক্ট টাইমিং!
কিন্তু এজেন্সি কিঞ্চিৎ ভয় দেখাইলো! কইলো, থাই লায়ন ঠিকঠাকমতো আকাশে উড়তে পারে না। সাথে লাগেজ নিতে দেয় না। মাঝেমধ্যে রাস্তা হারায়া ফালায়। বিমানবালা কাস্টমারের কাছে টাকার বিনিময়ে সার্ভিস দেয়, মানে খাবারদাবার বিক্রি করে! আরো কতো কি!
এজেন্সির বদদোয়ার বদৌলতেই কিনা জানি না, শেষমেশ থাই লায়নের টিকেটের দাম চৌদ্দ হাজার+ হওয়াতে এইটা বাদ্দিয়া ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের টিকেট নিলাম ১৪৯০০/- রিটার্ন। ইউএস-বাংলা'র বেশ কয়েকটা এক্সিডেন্ট সমালোচিত হওয়ার পর ওই এয়ারলাইন্সের টিকেটের দাম প্রায় সবসময়ই কম থাকে। কিন্তু ওভারল সার্ভিস সন্তোষজনক না! 😒
সকাল দশটার বিমান আড়াই ঘন্টার ফ্লাই করবে। থাইল্যান্ড আমাদের চেয়ে এক ঘন্টা এগিয়ে। বেলা দেড়টায় সুবর্ণভূমি এয়ারপোর্টে গিয়া থামল আমাদের বিমান। এই এয়ারপোর্টে আমার দ্বিতীয়বার পা ফেলা!
বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনে ছুটির কাগজ না থাকায় ঝামেলা হইছে। পরে এক পরিচিত এডিসি'রে দিয়া উদ্ধার পাইছি৷ কিন্তু থাই ইমিগ্রেশনে কিছুই বলে নাই।
ট্রাভেলপ্ল্যান অনুযায়ী ব্যাংককেই থাকতে চাইলে চলে যাবেন সুখুম্ভিত এরিয়ায় যেখানে বেশীরভাগ বাঙালী থাকে। যেতে হলে আপনাকে বাস কিংবা বিটিএস স্কাই ট্রেন কিংবা ট্যাক্সি ধরতে হবে। বাস ভাড়া সবচে কম।
এছাড়া ব্যাকপ্যাকারদের জন্য সেরা জায়গা খাওসান রোড যেতে ধরতে হবে শাটল বাস। এক ঘন্টা লাগবে ৩২ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে যেতে। অথবা যথারীতি বিটিএস স্কাইট্রেন + বাস। আর আরামে যেতে চাইলে খরচ পড়বে এক্টু বেশী, ট্যাক্সিতে করে। সাথে লাগেজ থাকলেও এখানে বাস কিংবা ট্রেনে চড়তে সমস্যা নেই। তবে সতর্ক থাকবেন যেন কারো গায়ে না পড়ে।
ব্যাংককের বাইরে পাতায়া যেতে চাইলে নিচ তলায় গেলেই পাবেন সরাসরি বাস সার্ভিস মাত্র ১২০ থাই বাথে।
এছাড়া ফুকেট কিংবা ক্রাবি যেতে চাইলে প্রথমেই চলে যাবেন ফুকেট বাস টার্মিনাল-২ তে। বাসভেদে ভাড়া পড়বে ৭০০-১০০০ থাই বাথ।
ফুকেট কিংবা ক্রাবিতে এয়ারে যাওয়া বেস্ট। সেক্ষেত্রে আগেই টিকেট কেটে রাখলে খরচ পড়বে বাসের চেয়েও কম। ডন মুয়াং এয়ারপোর্ট থেকেই বেশীরভাগ এয়ারক্রাফট ছেড়ে যায়। ফ্রি শাটল বাসে এক ঘন্টায় পৌঁছে যাবেন সুবর্ণভূমি থেকে ডন মুয়াং এয়ারপোর্টে!
ব্যাংককের খাও সান রোডে মাত্র ২০০ বাথেও রুম পাওয়া যায়। শেয়ারড বাথরুম। ব্যাকপ্যাকারদের জন্য এই জায়গাটা আদর্শ।
আমরা একেবারে খাও সান রোডেই রুম নিলাম মাত্র ৫০০ বাথে। ব্যাংককে বাইক ভাড়া পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়েই লোকাল বাসে চড়তে হচ্ছে। তবে শহরের প্রায় সর্বত্রই বাসে যাওয়া যায়।
এবার ব্যাংকক এসে প্রথমেই দৌড় দিলাম মাদাম তুসো জাদুঘরে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে মিটিংটা সাইরা ফেলতে।
এয়ারপোর্ট থেকেই ওদের বিটিএস স্কাই ট্রেনে উঠলাম। স্টেশনের নাম "ফায়া থাই"! প্রতিজনের ভাড়া ৪৫ বাথ, মানে ১৩০/- টাকা। থাই এক বাথ হচ্ছে বাংলাদেশী প্রায় ৩ টাকার সমান! বাংলাদেশ থেকে আসার সময়ই কিছু বাথ নিয়ে আসছিলাম। এবার ফায়া থাই থেকে সিয়াম, ভাড়া ২৫ বাথ। জাদুঘরে ঢুকতে এক হাজার বাথ লাগে। তবে আগেই অনলাইনে ক্লুকে বুকিং কিংবা ডিটাকের সীমের অফার কাজে লাগাইলে ৩০% ডিসকাউন্ট দেয়। অফারটা কাজে লাগাইলাম শপিং মলের নীচ থেকে সীম কিনে নিয়ে। সিয়াম শপিংমল অনেকগুলা। মাদাম তুসোতে যেতে হলে সিয়াম ডিসকভারিতে যেতে হবে। পাশেই দেখবেন সিয়াম প্যারাগন, সিয়াম সেন্টার। ডিসকভারির চার তলায় মাদাম তুসো জাদুঘর। এখানে আছে আইনস্টাইন, মাইকেল জ্যাকসন, প্রিন্সেস ডায়ানা, মাহাথির মোহাম্মদ, ওয়ান ডিরেকশন, ডেভিড ব্যাকহাম, জাস্টিন বিবার সহ অনেকেই।
মাদাম তুসোতে ছবি তোলা কিংবা ভিডিও করা যায় ইচ্ছামত। এটা এক্টা " মাস্ট ভিজিট" এট্রাকশন। এই টিকেটে এক্টা দশ মিনিটের 4D মুভি ফ্রি দেখতে পারেন, চমৎকার।
পরদিন সকালেই বের হয়ে গেলাম শপিং করতে। উদ্দেশ্য শপিং শেষে বিকেলে ঘুরবো গ্রান্ড প্যালেস মিউজিয়াম, স্কাইভিউ বার আর ওয়াট আরুন।


স্কাইভিউ রেস্টুরেন্ট কিংবা বার ব্যাংককে প্রায় ১০ টি রয়েছে। এসব বারে যেতে সুশীল সেজে যেতে হয়। লুংগী কিংবা আন্ডারগার্মেন্টস এলাউড না। এমনকি স্যান্ডেলও না।
স্কাইভিউ রেস্টুরেন্টে গিয়ে সন্ধার ব্যাংকক দেখা খুবই রোমান্টিক ঘটনা। চারপাশে রঙিন আলো জ্বলার পাশাপাশি ডুবন্ত সূর্যের লালচে আলো মিশে অদ্ভুত এক আবহ তৈরি হয় চারপাশে। এখানকার সর্বোচ্চ স্কাইভিউ রেস্টুরেন্ট ৬৭ তলায়। মিনিমাম ৩৭ তলায়। রুফটপ স্কাই লাউঞ্জ এর মধ্যে এক্টা।
ড্রিংক করার অভ্যাস না থাকলে এসব বারে যাওয়া উচিৎ হবে না।
ওয়াট আরুন ব্যাংককের সবচে বিখ্যাত মন্দির। ব্যাংকক বলতেই আমাদের সামনে যে প্রতিকী ছবিটা ভাসে সেটা এই মন্দিরেরই।
চাও ফ্রায়া (Chao Phraya) নদীর কোল ঘেঁষে এই মন্দির।
নদীর ওপার যেতে ছোট ছোট নৌকা রয়েছে। ভাড়া ১০ বাথ। ওপারে রয়েছে বিখ্যাত গ্র্যান্ড প্যালেস। ঢুকতে ৫০০ বাথ লাগে প্রতিজনের। একসময়ের রাজপ্রাসাদ এই প্লাজা। থাই রাজকীয় ঐতিহ্য জানতে এটা ভিজিট করা যায়। তবে আমরা যাইনি এন্ট্রি ফি বেশী তাই! 😑
চাও ফ্রায়া নদীতে "রিভার ক্রুজ" জার্নি করা যায়। বুফে থাই খাবার আর ব্যাংককের চারপাশ ঘুরিয়ে দেখাতে এই জার্নিটাও চমৎকার। খরচ হবে ১০০০ বাথ প্রতিজন।
ব্যাংকক শহর থেকে প্রায় ৪০কিলোমিটার দূরে রয়েছে সাফারি ওয়ার্ল্ড এবং মেরিন পার্ক। বাসে করে যাওয়া যায়। দুইটাতে একসাথে ঢুকতে লাগবে ১২০০ বাথ। টিকেট কাটতে বিভিন্ন অফার অথবা ক্লুকডটকম ব্যবহার করতে হবে।
ডলফিনের ওয়াটার ডান্স, বিভিন্ন পাখি আর পশুর মজাদার সব কাজকর্ম দেখে মনে হবে সবই আপ্নার টাকা উসুলের জন্যই! ব্যাংককের জন্য এই পার্ক দুটো মাস্ট ভিজিট এট্রাকশন।
ব্যাংককে লোকজন আসে বোধহয় থাই মাসাজ নিতে! শতশত মাসাজ সেন্টার এখানে। ছেলে-মেয়ে সবাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বডি মাসাজ, অয়েল মাসাজ, ফুট মাসাজ, নেক, হেড থেকে শুরু করে এমনকোন অর্গান নাই যেইটার মাসাজ হয় না! খরচ ১৩০ বাথ থেকে শুরু।
ব্যাংককের মূল থাকার জায়গা, মানে দেশীয়রা যেখানে থাকে সেটা হচ্ছে সুখুম্ভিত। এখানেই আছে "নানা ডিস্ট্রিক্ট" (Nana District)। নানা মানে গ্রান্ডপা কিংবা বিবিধ না, একজন থাই বিজনেস টাইকুনের নামে প্রতিষ্ঠিত বিজনেস গ্রুপ। লোকটা ইন্ডিয়ান মুসলিম ছিলো। পরে ব্যবসা আর রাজনীতি করে থাইল্যান্ডের প্রভাবশালী হয়েছে। নানা ডিস্ট্রিক্টে আছে নানা শপিংমল। পাশেই আছে পৃথিবীর সবচে বড় রেড লাইট ডিস্ট্রিক্ট "নানা প্লাজা"। এর গেটেই উল্লেখ আছে "World's largest adult playground"! প্লাজায় রয়েছে শতাধিক বার। বারে মেয়েরা সেজেগুজে ট্যুরিস্টদের ডাকছে সেবা দিতে! থাই যেসব মেয়েরা এখানে কাজ করে এদের প্রায় কারো চেহারাই সুন্দর না। সম্ভবত এরা খুবই দরিদ্র আর অশিক্ষিত গ্রামের মেয়ে।
পুরো থাইল্যান্ডে আমরা বাসে, ট্রেনে, শপিংমল আর ফুড শপগুলোয় যেসব থাই মেয়ে দেখেছি তারা প্রায় সবাই কিউট। পাতায়া, ফুকেট কিংবা ব্যাংককের এসব বারে কাজ করা মেয়েদের সাথে পথেঘাটে দেখা মেয়েদের চেহারায়, কথায় আর আচরণে আকাশপাতাল পার্থক্য আছে। তবে ভেতরে সবারই এক! 🤐
ব্যাংককের রাস্তায়ও প্রচুর পোকামাকড় পাওয়া যায়। যেখানেই বিদেশি ট্যুরিস্ট...মানে সুখুম্ভিত, খাওসান রোড এরিয়ায় এসব পোকামাকড় বেশী পাওয়া যায়। সন্ধ্যার পরেই এরা আসে। শখের বসে চড়া দামে অনেকেই এগুলো খায় মূলত ফেবু, ইন্সটাগ্রামে ভিডিও/ছবি দেয়ার জন্য। সাপ, বিচ্ছু, চ্যালা, কুমির সবই আছে।
তবে এগুলো কখনোই ট্রাই করবেন না। বিষাক্ত কিংবা পেটে এডজাস্ট না করার কারণে অসুস্থতার অনেক রেকর্ড আছে। আমরা তো দেখেই অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম! 😏
ব্যাংককে গেলে টাকা থাকুক বা না থাকুক শপিং মাস্ট! শপিং করার জন্য দুইটা শপিংমল সাজেস্ট করবো। তুলনামূলক কম দামে জিনিসপত্তর কেনার জন্য "প্রাতুনাম" উরফে "প্লাটিনাম" সেরা। বিশাল এই শপিংমল আমাদের দেশের যমুনা ফিউচার পার্কের চেয়ে দ্বিগুণ হওয়ার কথা। একেক ফ্লোরে একেক আইটেম সাজিয়ে বসে আছে মেয়েরা! ওহ, এখানে ছেলে বিক্রেতার সংখ্যা খুবই কম! মেয়েরাই কেনাবেচা করে। এরাও যথারীতি ইংরেজি জানে না। আপ্নি যদি গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, হোয়াটস ইউর নেইম?
সে ক্যালকুলেটর বের দেখাবে দুইশ পঞ্চাশ!
মানে ওর দোকানের প্রোডাক্টসের খুচরা মূল্য!
প্লাটিনাম শপিংমলে একশ থাই বাথে এমনসব আকর্ষণীয় ঘড়ি পাবেন উপহার হিসেবে যা অসাধারণ। এছাড়া ছাতা পাবেন দুইশ বাথে। এগুলো সবই সুভেনিয়্যর হিসেবে অদ্বিতীয়।
এমবিকে (MBK) নামে পায়ে হাটা দূরত্বে আরেক্টা শপিংমল আছে। কোয়ালিটি প্রোডাক্ট এখানে এভেইলেবল, দামও তুলনামূলক কম। প্রাতুনামে পাওয়া যায় না এমন কিছু পাবেন এম্বিকেতে।
তবে ব্যাংককে প্রচুর শপিংমল আছে যেগুলোতে কেনাকাটা করা মধ্যবিত্তদের জন্য প্রায় অসম্ভব!
"সেন্ট্রাল ওয়ার্ল্ড ব্যাংকক" নামে আরেকটা শপিংমল আছে যেটাতে কেনাকাটা না করলেও শুধুই ঘুরতে যাওয়া উচিৎ। থাইল্যান্ডের সবচে বড় শপিংমল ধরা হয় সেন্ট্রাল ওয়ার্ল্ডকে। এখানে শপিংয়ের পাশাপাশি ফ্রি এবং পেইড রিক্রিয়েশনেরও সব ব্যবস্থা আছে। পুরো মল ঘুরে সব মজা শুষে নিতে কমপক্ষে অর্ধেক দিন বরাদ্দ রাখতে হবে।
তবে সবমিলিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে এলকোহল, মাসাজ আর সিলেক্টেড কিছু কাপড়ের আইটেম ছাড়া সবকিছুর দামই চড়া! কিন্তু "থাইল্যান্ড" নামই এক্টা ব্র্যান্ড, এটাও মাথায় রাখতে হবে! 
শপিং বাদ দিলে ব্যাংককে ঘুরতে দুই দিনে ঢাকা থেকে যাওয়া আসা, সব বেলার খাবার, সব লোকাল ট্রান্সপোর্ট আর ভিসা খরচসহ মোট ৩০ হাজার টাকা লাগবে। এটা একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত ট্রাভেলারের হিসাব।

No comments:

Post a Comment