Sunday, 1 December 2019

নিঝুম শহর ক্রাবিতে একদিন (ডিসেম্বর-২০১৯)


ডন মুয়াং এয়ারপোর্ট এতো বড় ভাবি নি। আমার কাছে সুবর্ণভূমির চেয়েও এটা সুন্দর এবং বড় মনে হইছে। আমাদের ফ্লাইট এইবার এয়ার এশিয়ায়। এইটাও এক্টা বাজেট এয়ারলাইনস। ব্যাংকক টু ক্রাবি মাত্র ২৫০০/- টাকা ভাড়া! দূরত্ব ৮৫৬ কিলোমিটার।
এয়ার এশিয়ার এই ফ্লাইটে একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে আছি আমরা দুজন। ২২০+ যাত্রীর সবাই সাদা চামড়ার। সম্ভবত ৯০% লোক ইউরোপীয়। মানে এরা সবাই মসিয়ে ফ্রসিয়ে ট্যাব্রাগ্রেল টাইপের শব্দ দিয়ে কথা বলছিলো! তবে মুগ্ধ হয়ে গেছি সবার আচরণ আর সৌজন্যতাবোধে। বাজেট এয়ারলাইনস হওয়ায় কোন খাবার দেয় নি। যদিও অসংখ্য কিউট মানুষ দেখে সেই দুঃখ ভুলে মনে ছিলো না। এয়ার এশিয়ার এই ফ্লাইটটি-ই বোধহয় আমার স্বল্প অভিজ্ঞতার সেরা ফ্লাইট!
ক্রাবি এয়ারপোর্টে নামলাম রাত ১২ টায়। এই সময়টা হোটেলে না গিয়া এয়ারপোর্টেই রোহিঙ্গা স্টাইলে ঘুম দিলাম ফজরের আগ অব্দি। শিডিউল এভাবেই সাজানো ছিলো। কিন্তু এয়ারপোর্টে এসি থাকায় ঠান্ডায় কষ্ট হইছে খুব! 🥴🤕
ক্রাবি এয়ারপোর্ট খুবই ছোট্ট। আমাদের কক্সবাজার এয়ারপোর্টের মতো! এর রানওয়ে উচু থেকে নিচুর দিকে!
ক্ষুধা লাগছে বেশ, কিছু খেতে হবে। এয়ারপোর্টের বাইরে দুইটা খাবারের দোকান আছে। গেটের ডান পাশেই। খাবারের দাম কম হলেও সব খাবারই পিউর থাই! ফলে থাই ফুডের ঐতিহাসিক গন্ধটা নাকে লাগামাত্র অস্বস্তি শুরু হইছে। সেইটা ছিল ইউএস-বাংলার ফিরতি ফ্লাইটে উঠার আগ অব্দি। আমরা ৪০ বাথ করে ৮০ বাথে দুই প্যাকেট চিকেন রাইস নিলাম। মানে মুরগী ভাত আরকি! এরা মুরগীর চামড়া ছিলে না। আমার বমি আটকে কোনমতে খেয়েই জুস আর কফি নিলাম আগে কি খেয়েছি সেটা ভুলতে!
এয়ারপোর্ট থেকে ক্রাবি শহরে যেতে শেয়ারড জীপে লাগে ২০০ বাথ। আর বিখ্যাত অনাং (Ao Nang) বীচে যেতে লাগে ২৫০ বাথ। বাসে গেলে ১৫০ বাথ! বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে অনাং বীচের পাশে গিয়ে থাকা। ওখানকার হোটেল সস্তা। খাবারও ভালো।
ক্রাবি শহরে নেমে মন বিষণ্ণ হয়ে গেলো। বিষন্ন নীরব শহরের প্রভাব! সবকিছু শান্ত। যেন গতকাল রাতে ভয়ানক কোন ঘটনা ঘটে গেছে শহরজুড়ে, কোথাও কেউ নেই। ক্রাবিকে আমি বলবো থাইল্যান্ডের নিঝুম দ্বীপ!
শহরের ছিমছাম গোছানো রাস্তায় হাটতে হাটতে এক্টা বুথে গিয়ে ফিফি আইল্যান্ডে যাওয়ার ফেরীর (আসলে ইয়ট, Yacht) টিকেট বুক করলাম ৩৫০ বাথ দিয়ে। দুজনের জন্য ৭০০ বাথ। ফেরী টাইম ১ টায়, রিপোর্ট টাইম ১২ টায়।
পূর্বপ্ল্যানানুযায়ী স্কুটি ভাড়া নিলাম। স্কুটার সাধারণত ২০০ বাথ (৬০০/- টাকা) হইলে সারাদিনের জন্য ভাড়া পাওয়া যায়। যেহেতু আমার হাতে ৩ ঘন্টা আছে, সেটা অল্প সময়, এর জন্য ১৫০/- বাথ নিলো বাইকের মালিক, নাম নিক্কি; একজন নিপাট থাই ভদ্রমহিলা। স্কুটি চালাইতে ড্রাইভিং লাইসেন্স লাগে, পাসপোর্ট দেখাইলে ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলেও দেয়। হেলমেট একজনের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে ওদের নামমাত্র হেলমেটের অসুবিধা হচ্ছে এক্টু জোরসে টান দিলেই বাতাসের সাথে উড়ে যায়!
তেল  নিলাম ৫০ বাথের। তেলকে থাইল্যান্ডে "গ্যাস" কিংবা "গ্যাসোলিন" বলে। পাম্প থেকে নিলে ২৭-২৮ বাথ প্রতি লিটার। আর বোতলে যেকোন দোকান থেকে নিলে ৪০ বাথ! তবে এই তেল/গ্যাসোলিনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এক লিটারে বহু পথ পাড়ি দেয়া
যায়। সম্ভবত বাংলাদেশের অকটেনে (তেলে) ভেজাল থাকে এইজন্য এই পার্থক্য।
আমি আগে কখনো স্কুটার চালাই নি। কোনটা চাপ দিলে সাম্নে যায়, কোনটা চাপলে পিছে যায় জানা নাই। আল্লাহর উপর ভরসা কইরা সবগুলা সুইচ এক্টা এক্টা চাপ্তে থাকলাম। একসময় স্কুটারও চলতে শুরু করলো। গেলাম অনাং বীচে। শহর থেকে ২২/২৩ কিলোমিটার দূরে। পাহাড়ী আঁকাবাঁকা ছবির মতো সুন্দর সড়কের দুপাশে দালানের মতো খাড়া পাহাড়! সাথে অসাধারণ পথ আর বীচের ভিউ দেখে স্কুটার চালানোর সময় নিজেদের উত্তম-সূচিত্রা না ভাবার কোন কারণ ছিলো না। এখানকার খাড়া খাড়া পাহাড়ে "রক ক্লাইম্বিং" করে বিদেশীরা! টাকা লাগে এসব করতে!
স্কুটিতে অনাং যেতে আমাদের ২৫ মিনিটের লেগেছে। এখানেও ট্যুরিস্টের ভীড় আছে যথেষ্ট।
অনাং বীচের পাশেই এক্টা বড় মসজিদ রয়েছে। রাস্তার পাশের "স্ট্রিট ফুডের" অনেক দোকানেই "হালাল" লেখা রয়েছে। হালাল লেখা না থাক্লে নিশ্চিত থাকতে পারেন পর্ক (শুয়োর) রয়েছে, একই তেলে হয়তো মুরগী ভেজে রাখছে! থাইল্যান্ডের স্ট্রিট ফুড দুনিয়াবিখ্যাত! দাম, ফ্রেশনেস আর স্বাদের জন্য এই সুনাম। তবে ওদের খাবারে কি এক্টা মশলা/পাতা দেয়। সেটার বিশ্রী গন্ধটা এখনো বাথরুমে গেলে নাকে আসে! 😷😷
ক্রাবি আর অনাং বীচের আশপাশে প্রচুর হিজাব পরিহীতা মেয়ে দেখলাম রাস্তায় কিংবা দোকানে কাজ করছে। আবার কেউ কেউ জাস্ট উদোম গায়ে! শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কতো বেশী পার্থক্য!!
অনাং এবং রেইলে (Ao Nang & Railay) হচ্ছে ক্রাবির উরফে থাইল্যান্ডের বিখ্যাত বীচের দুইটা। রেইলে বীচ ওয়ার্ল্ড টপ টেন বীচের মধ্যে ৭ম! অনাং বীচে গিয়ে ৫০ বাথে লং টেইল নৌকায় দশ মিনিটে পৌঁছে যেতে পারবেন রেইলে বীচে। লং টেইল মানে যে নৌকার এক্টা দিকে লম্বা এক্টা অংশ থাকে যার সাম্নে দাড়িয়ে লোকে সেল্ফি তোলে ফেসবুকে আপলোড দিয়ে বুঝায় যে সে এখন ক্রাবি কিংবা ফুকেট চলে আসছে।
ক্রাবি শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে এক্টা চমৎকার পন্ড/পুকুর/পুল আছে, নাম এমারেল্ড পুল! সাথেই গরম পানির ঝর্ণা আছে। এইটায় ঢুকতে ২০০ থাই বাথ লাগে। যাইতে হয় স্কুটার ভাড়া কইরা। ডাইরেক্ট কোন লোকাল বাস নাই। পুল সকাল ৮ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত খোলা। পুলের পানি স্বচ্ছর চেয়েও স্বচ্ছ!
ক্রাবি শহরেই "ফ্লাই এন্ড জাম্প" নামে এক্টা সুইমিং পুল আছে। এটাতেও ঢুকতে ৩০০/- বাথ লাগে। ভালো সাতার জানলে এইটাতে যাওয়া উচিৎ। আমি ভালো সাতার জানি না, খারাপ সাতার জানি। এইজন্য যাই নি। অবশ্য টাকার অভাবে যাইনি বললেও অত্যুক্তি হবে না! 😉
শহরের কাছেই আছে টাইগার কেভ। প্রায় ১২৩২ টি সিড়ি টপকে শীর্ষে উঠলে ক্রাবি শহর চোখের সাম্নে চলে আসবে। বিশালাকৃতির একটা গোল্ডেন বুদ্ধমূর্তিও আছে এখানে।
ক্রাবি শহর ক্রাবি নদীর তীরে অবস্থিত। নদীর তীর পাকা করা, বেশকিছু স্থাপনাও আছে। চওড়া রাস্তা ধরে স্কুটার চালানোর সময় এসব স্থাপনায় ছবি তুলতে পারেন। মাড ক্রাব স্কাল্পচার তেমনই এক্টি! এখানকার ভিউটাও চমৎকার। এরকম এক্টা জায়গা ঢাকায় থাকলে আমি এখানেই সময় কাটাতাম।
থাই লোকেরা বোধহয় কখনো চিটারি করে না। এরা যতো টাকা নিবে তার বিনিময় অবশ্যই দিবে। কিছুতেই মাত্রাতিরিক্ত রাখে না। যদিও আমাদের মতো দরিদ্র ট্রাভেলারদের জন্য ওইটাই অনেক টাকা!
পুরো ক্রাবি শহরে রাস্তা দেখানোর কাজ করেছে গুগোল! শহর থেকে স্কুটারে অনাং যাওয়া আসার নির্দেশনা গুগলের। এখানকার লোকজন, মানে পুরো থাইল্যান্ডের সাধারণ মানুষ মোটেই ইংরেজি তো জানেই না, সামান্য বাংলাটাও জানে না। এমনও হইছে যে আমি ইংরেজিতে এক্টা কুশ্চেন করছি সে পাল্টা থাই ভাষায় তারমতো সবকিছু বইলা আরামে চোখ বন্ধ করে ফেলছে! অথচ আমি কিছুই বুঝি নাই। তাছাড়া থাই এবং ইংরেজি ভাষার নিজ নিজ ক্ষেত্রে সমস্যা আছে! যেমন থাই ভাষায় ট (T) নাই, আবার ইংরেজী ভাষায় ত নাই! ফলে থাইল্যান্ডের মানুষ ইংরেজি বলতে গেলে সেটা জাপানিজ হয়ে যায়! 😂
ক্রাবি তথা পুরো থাইল্যান্ডে "সেভেন এলিভেন" এবং "ফ্যামিলি মার্ট" নামে স্বপ্ন/অগোরা/মীনাবাজার টাইপের সুপারশপ আছে সর্বত্র। অনেক্টা ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের মতো, ঘরে ঘরে!! এসব শপে দিনের এবং রাতের ব্যবহার্য, আহার্য সব পাবেন, সঅঅঅঅব।
পুরো থাইল্যান্ডে দিনের বেলায় হাবিয়া দোযখ থেকে আগত আগুণের হলকা বইতে থাকে। ফলাফল হিসেবে একদিনেই নিজেরে নিগ্রো, কমপক্ষে পিউর তামিল ভিলেন হিসেবে দেখতে পাইলাম। মাথার উপ্রে এক্টা হ্যাটের অভাব বোধ করলাম। সানগ্লাসেরও! আমি কেন অন্ততঃ সানগ্লাসটি নিয়ে আসি নি সেটা অনেকক্ষণ ভেবেও বুঝতে পারি নি! চেহারার নিগ্রো দশা দেশে ফেরারও এক মাস পর্যন্ত ছিলো।
ব্যাকপ্যাকার হিসেবে দুজনে যাত্রা করেছিলাম! আমি আমার যন্ত্রপাতি ঢাকতে এক্টা আন্ডারওয়্যার নিয়েছিলাম। সেই আন্ডারওয়্যার ঢাকতে আবার এক্টা জিন্স। আর উপরে টিশার্ট! আর কিচ্ছু না! তবে আপ্নাদের কি কি জিনিস নিতে হবে তা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন!?!
অনাং ঘুরে বাইক জমা দিতে গেলাম ক্রাবি শহরে। যেখান থেকে ইয়টের টিকেট বুক করেছি! ওদের টাইম মেইন্টেইনিং বেসম্ভব কড়া! আমার ১২.০৮ বেজে যাওয়ায় নিক্কি ভদ্রমহিলা কপট রাগ দেখিয়ে থাই ইংরেজিতে বলে, ইউর লেত এইত মিনিত। ইউর কার গন। নেক্স কার তেন মিনিত লেতার!
(তর্জমাঃ আপ্নি আট মিনিট দেরী করে এসেছেন। আপ্নার নির্ধারিত গাড়ী চলে গেছে। পরের গাড়ী দশ মিনিট পরে আসবে)
কিন্তু ঠিক পাচ মিনিট পরেই এক্টা এসি মাইক্রো এসে হাজির। আমরা দ্রুত খাবারের প্যাকেট নিয়ে গাড়ীতে উঠলাম। খাবার ছিল গরু, সব্জী আর ভাত। দাম ৪০ বাথ! হালাল ফুডের দোকান থেকে কেনা।
পুরো ক্রাবি দেখতে আপ্নাকে কমপক্ষে দুই দিন এক রাত থাকতে হবে। আর নিতে হবে স্কুটার ভাড়া। নইলে ট্যাক্সি ভাড়া অনেক পড়বে।

No comments:

Post a Comment